বিশ্ব

পশ্চিমবঙ্গে মমতার দুর্গ যেভাবে ভাঙলো বিজেপি

  • 12:39 pm - May 05, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩২ বার
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। ছবিঃ আনন্দবাজার

মেলবোর্ন, ৫ মে- ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির এক প্রান্তে প্রতিদিনের মতোই কাজ করেন সীমা দাস। সংসার চালাতে শহরে থেকে গৃহকর্মীর কাজ করলেও তার মন পড়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে। কিন্তু এবারের যাত্রা ছিল আলাদা। দুই দিন ধরে একাধিক ট্রেন বদলে, ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দিয়ে তিনি গ্রামে ফিরেছিলেন শুধুমাত্র একটি কারণে, ভোট দেওয়ার জন্য। সেই ভোট, যা শেষ পর্যন্ত বদলে দিল পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা।

সীমা দাস বহু বছর ধরেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে আসছিলেন। ২০১১ সাল থেকে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা এই দলটি তার কাছে ছিল স্বাভাবিক পছন্দ। কিন্তু এবারের ভোটের আগে পরিবারেই বদলে যায় তার দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষ করে শাশুড়ির কথায় তিনি প্রভাবিত হন। তার শাশুড়ি অভিযোগ তোলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল মুসলিমদের পক্ষ নিচ্ছেন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তোষণের রাজনীতি করছেন। সেই ধারণাই শেষ পর্যন্ত সীমার ভোটের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঝড়, ২০০ পেরিয়ে ক্ষমতার দোরগোড়ায় ,ছবি: সংগৃহীত

এই একক অভিজ্ঞতা আসলে বৃহত্তর এক পরিবর্তনের প্রতিফলন, যা ধীরে ধীরে জমে উঠেছিল পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রায় ৯ কোটিরও বেশি মানুষের এই রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কিন্তু সেই জমাট শক্তির ভেতরেই ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি, যা একসময় এই রাজ্যে প্রান্তিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো।

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে সেই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২৯৪ আসনের মধ্যে প্রায় ২০০টির বেশি আসনে জয় বা এগিয়ে থেকে বিজেপি এক অভাবনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা নেমে এসেছে ৮৭-এর আশেপাশে। ২০২১ সালের নির্বাচনে যেখানে বিজেপির সর্বোচ্চ অর্জন ছিল ৭৭টি আসন, সেখানে এই ফলাফল এক ঐতিহাসিক উত্থান।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ফল শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রতিফলন। ধর্মীয় মেরুকরণ, সরকারবিরোধী মনোভাব এবং সংগঠিত নির্বাচনী কৌশলের সমন্বয়ে এই সাফল্য এসেছে।

নরেন্দ্র মোদী , ছবিঃ সংগৃহীত

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক যাত্রা নিজেই ছিল সংগ্রামের প্রতীক। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকে তিনি নিজেকে সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

তার শাসনামলে নারীদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু হয়। গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে কিছু অগ্রগতিও দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ জমতে থাকে। তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। অনেকেই মনে করতে শুরু করেন, দলটি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক হয়ে উঠেছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাদের হস্তক্ষেপ বেড়ে গেছে।

নির্বাচনী বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপি এই অসন্তোষকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়েছে। তারা শুধু ধর্মীয় মেরুকরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বুথভিত্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে তারা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও ছিল নজিরবিহীন। প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৯২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এটি রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোটদানের রেকর্ডগুলোর একটি।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রেকর্ডভাঙা ভোট। ছবিঃ সংগৃহীত

বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস ভোটারদের সামনে নতুন কোনো আকর্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পারেনি। একই সঙ্গে বিরোধীদের প্রতি তাদের আচরণ অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক হিসেবে দেখা গেছে। ফলে দোদুল্যমান ভোটাররা ধীরে ধীরে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন।

এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন। এর মধ্যে অনেকেই ভোটাধিকার হারান। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, এই প্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট ছিল এবং বিশেষ করে মুসলিম ভোটারদের প্রভাবিত করেছে।

যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু এই কারণেই বিজেপির জয় হয়নি। বরং এটি ছিল একাধিক কারণের সম্মিলিত ফল। এর মধ্যে ছিল দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী মনোভাব, ধর্মীয় মেরুকরণ, এবং শক্তিশালী নির্বাচনী কৌশল।

নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সংগঠন, প্রচার এবং ডিজিটাল যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই তারা সুসংগঠিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যু তুলে ধরে জনমত গঠনে তারা সক্রিয় ছিল।

অন্যদিকে, নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোম্পানি আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়, যা একটি রেকর্ড। সরকার বলছে, এটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, এটি ভোটারদের প্রভাবিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন শহর ও গ্রামের ভোটারদের মধ্যে বিভাজন। শহরের ভোটাররা বেশি মেরুকৃত হয়ে পড়েছিলেন, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় মুসলিম ভোটারদের উপস্থিতি এবং তার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে , ছবিঃ সংগৃহীত

এই নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেকেই নরেন্দ্র মোদির বিকল্প হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু এই পরাজয় সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিতে পারে। অন্যদিকে বিজেপির জন্য এটি একটি শক্তিশালী বার্তা—তারা শুধু উত্তর বা পশ্চিম ভারতে নয়, পূর্ব ভারতেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম।

তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত সহজে হাল ছাড়বেন না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভোট গণনার সময়ই তিনি দলীয় কর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেছেন এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, তারা বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করবেন।

এই নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জয় বা পরাজয়ের গল্প নয়। এটি একটি সমাজের ভেতরের পরিবর্তনের প্রতিফলন। মানুষের মনস্তত্ত্ব, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক কৌশল সবকিছুর জটিল সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এই ফলাফল। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। সামনে কী হবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত এই নির্বাচন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।

সূত্রঃ আল-জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au