এবার বিজিপি শাসন দেখবে পশ্চিমবঙ্গ
শ্যামল সান্যাল, ঢাকা মেলনোর্ম,৫ মে- ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। সে নির্বাচনে পরিবর্তনের ঢেউয়ে পরাজিত হয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীও…
মেলবোর্ন, ৫ এপ্রিল- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে পর্যন্ত রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, ক্ষমতায় ফিরবে কি না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র দল, নাকি প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করবে ভারতীয় জনতা পার্টি(বিজেপি)। রবিবার রাত পর্যন্ত এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনায়। তবে সোমবার দুপুরের পর ফলাফল স্পষ্ট হতে শুরু করলে দৃশ্যপট বদলে যায়। নিশ্চিত হয়ে যায়, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসছে বিজেপি। এর পরই নতুন করে সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কে হচ্ছেন রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী।
ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর থেকেই বিজেপির ভেতরে ও বাইরে সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রীর নাম নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো নাম ঘোষণা করা হয়নি, তবু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আগের বক্তব্য ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কয়েকজন নেতাকে ঘিরেই বেশি জল্পনা তৈরি হয়েছে।
এর আগে নির্বাচনী প্রচারে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন এমন একজন নেতা, যিনি বাংলায় বড় হয়েছেন এবং এখানেই রাজনৈতিকভাবে গড়ে উঠেছেন। এই বক্তব্যের পর থেকেই রাজ্য বিজেপির একাধিক নেতার নাম আলোচনায় আসে।

শুভেন্দু অধিকারী। ছবিঃ সংগৃহীত
সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন। এবারের নির্বাচনে তিনি শুধু নিজের আসনেই জয় পাননি, বরং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুরে পরাজিত করেছেন। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। এবারের ফলাফলেও তিনি নন্দীগ্রামে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। এসব কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে তিনি সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী।
তবে শুধুমাত্র শুভেন্দু অধিকারী নন, আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এই দৌড়ে আছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তার নেতৃত্বেই এবারের নির্বাচনে বিজেপি ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে। এর আগে দিলীপ ঘোষর সময়ে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ১৮টি আসন পেলেও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা সরকার গঠন করতে পারেনি। সেই ব্যর্থতার পর শমীক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বেই দলটি এবার ক্ষমতায় পৌঁছেছে।
যদিও শমীক ভট্টাচার্য এবারের বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেননি এবং বর্তমানে তিনি রাজ্যসভার সদস্য, তবু তাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হলে সংবিধান অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে তাকে বিধানসভায় নির্বাচিত হতে হবে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অতীতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ফলে এই সম্ভাবনাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অমিত শাহ’র সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী। ছবিঃ সংগৃহীত
উত্তরবঙ্গের রাজনীতিও এবারের ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই অঞ্চলে বিজেপি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে এবং তৃণমূলকে প্রায় পুরোপুরি হটিয়ে দিয়েছে। ফলে দলটির ভেতর থেকেই দাবি উঠেছে, উত্তরবঙ্গ থেকে কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করা হোক। সেই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারর নাম। নির্বাচনী প্রচারে তিনি রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন এবং সংগঠনের ভেতরেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
তবে বিজেপির সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া বরাবরই কিছুটা অপ্রত্যাশিত। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনেক সময় এমন কাউকে সামনে আনে, যিনি আগে থেকে আলোচনায় ছিলেন না। মধ্যপ্রদেশ বা দিল্লির মতো রাজ্যে অতীতে এমন উদাহরণ রয়েছে, যেখানে তুলনামূলক কম পরিচিত নেতাকেও মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গেও এমন কিছু ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, বিজেপি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখবে। এর মধ্যে রয়েছে সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসমর্থন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য। একই সঙ্গে দলটি এমন একজন নেতাকে বেছে নিতে পারে, যিনি রাজ্যের বিভিন্ন অংশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন এবং নতুন সরকারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবেন।
সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ৯ মে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে হাতে সময় খুব বেশি নেই। এর মধ্যেই বিজেপিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর নাম।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই অধ্যায়ের প্রথম পাতায় কার নাম লেখা থাকবে, তা জানার অপেক্ষায় এখন পুরো রাজ্য।
সূত্রঃ এই সময় পত্রিকা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au