মেলবোর্ন, ১২ মে- নিউজিল্যান্ডে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী হামলা ও বিদ্বেষমূলক আচরণ বাড়তে থাকায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বর্ণবাদী মন্তব্য, বিদ্বেষমূলক গ্রাফিতি এবং রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
অকল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় গত মাসে ভারতীয়দের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক ও সহিংসতাপূর্ণ গ্রাফিতি দেখা যায়। স্কুল, গণশৌচাগারসহ একাধিক জনসমাগমস্থলে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বার্তা স্প্রে পেইন্টে লিখে রাখা হয়।
নিউজিল্যান্ডের ভারতীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা বলছেন, তারা এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এবং সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে বৈরিতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
সম্প্রতি ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি হয়। নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট পার্টির উপনেতা শেন জোন্স, যিনি এই চুক্তির বিরোধিতা করেন, মন্তব্য করেন যে তিনি “বাটার চিকেন সুনামি” চান না। তার এই মন্তব্যকে ভারতীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
এর কিছুদিন আগে অকল্যান্ডের মেয়র ওয়েইন ব্রাউন রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরএনজেডের এক ভারতীয় কর্মীকে “মুসলিম সন্ত্রাসী” বলে মন্তব্য করেন। পরে অবশ্য তিনি ক্ষমা চান।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয় সাবেক তে পাতি মাওরি পার্টির সভাপতি চে উইলসনের একটি হাকা পরিবেশন ঘিরে। এটি ভারতীয় বংশোদ্ভূত এমপি পারমজিৎ পারমারকে উদ্দেশ্য করে করা হয়েছিল।
হাকাটিতে ভারতীয় সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গ করে তাকে “নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার” আহ্বান জানানো হয়। সেখানে ভারতকে দারিদ্র্য ও সমস্যায় জর্জরিত দেশ হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়।
পারমজিৎ পারমার নিউজিল্যান্ডের অ্যাক্ট পার্টির সংসদ সদস্য। তিনি মাওরি শিক্ষাবৃত্তি, মাওরি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা সুবিধা এবং ওয়াইতাঙ্গি চুক্তি বিষয়ক বাধ্যতামূলক কোর্সের বিরোধিতা করে আসছেন। তার এসব অবস্থানের সমালোচনা থাকলেও অনেকেই বলছেন, রাজনৈতিক মতবিরোধের নামে পুরো ভারতীয় পরিচয়কে আক্রমণ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
ফিজিয়ান ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাবেক ইয়াং নিউজিল্যান্ডার অব দ্য ইয়ার শানিল লাল বলেন, “পারমজিৎ পারমারের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করা অবশ্যই বৈধ। কিন্তু বিষয়টি পরে তার ব্যক্তিগত ও জাতিগত পরিচয়ের ওপর আক্রমণে পরিণত হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষের পরিচয়কে অপমান করেছে।”
শানিল লালের মতে, ভারতীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এখন ভয়াবহভাবে বেড়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা না নিলে তা আরও বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।
নিউজিল্যান্ড পুলিশের সর্বশেষ ঘৃণাজনিত অপরাধ সংক্রান্ত তথ্যেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মানুষই সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
গত বছর জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য নিরসনবিষয়ক কমিটিও নিউজিল্যান্ডে বাড়তে থাকা বর্ণবাদ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তারা সতর্ক করে বলেছিল, দেশটিতে মাওরি জনগোষ্ঠীর অধিকার দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং কিছু রাজনীতিক ও জনপরিচিত ব্যক্তির বর্ণবাদী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
বর্ণবাদবিরোধী কর্মী টিনা নগতার মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় নিউজিল্যান্ডে জাতিগত ইস্যুগুলো রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “প্রতিবার নির্বাচনের আগে আমরা দেখি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে জাতিগত ইস্যু ব্যবহার করা হয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং অভিবাসন ইস্যু ঘিরে উত্তেজনার কারণে নিউজিল্যান্ডে ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈরিতা বাড়ছে।
সুত্রঃ এবিসি নিউজ