মেলবোর্ন, ২৪ মে: বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, সহিংসতা এবং নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে নতুন এক মানবাধিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM) প্রকাশিত ৮৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে দেশের ৬২টি জেলায় অন্তত ৫০৫টি সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

দেশের ৬২ জেলায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরল HRCBM-এর নতুন প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনটি বলছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত বৈষম্য, ভয়ভীতি, ভূমি দখল, ধর্মীয় নিপীড়ন এবং বিচারহীনতার ধারাবাহিক প্রতিফলন। প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ড, রহস্যজনক মৃত্যু, অপহরণ, যৌন সহিংসতা, মন্দিরে হামলা, জমি দখল, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক-সাম্প্রদায়িক ভয় দেখানো (intimidation)-এর বিস্তৃত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সারা দেশে সহিংসতার বিস্তার
HRCBM-এর তথ্য অনুযায়ী, চার মাসে নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল ১৪৪টি শারীরিক হামলা ও অপহরণের ঘটনা, ১৩২টি জমি দখল, বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও সম্পত্তি লুটের ঘটনা, ১০০টি হত্যা বা রহস্যজনক মৃত্যু এবং ৯৫টি মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা। এছাড়া ২৮টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের অভিযোগও নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, সহিংসতা শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহিংসতা কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের আটটি বিভাগের প্রায় সব জায়গাতেই সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে, যেখানে ১১৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এরপর রয়েছে ঢাকা বিভাগে ৯৪টি, খুলনায় ৮৪টি এবং রংপুর বিভাগে ৬৭টি ঘটনা।
চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, কক্সবাজার, কুমিল্লা, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, ফরিদপুর ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোকে “হটস্পট” হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি।

মন্দিরে হামলা, জমি দখল, নারী নির্যাতন ও বিচারহীনতার অভিযোগে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংসতার এই বিস্তার প্রমাণ করে যে এটি কেবল স্থানীয় বিরোধ বা বিচ্ছিন্ন অপরাধের ফল নয়; বরং জাতীয় পর্যায়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সংকটের প্রতিফলন।
মন্দিরে হামলা ও ধর্মীয় নিপীড়ন
প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে মন্দির, প্রতিমা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার বিবরণ। HRCBM জানিয়েছে, চার মাসে অন্তত ৯৫টি ঘটনায় মন্দিরে ভাঙচুর, প্রতিমা ভাঙা, অগ্নিসংযোগ, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা এবং ধর্মীয় সম্পত্তি দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মাদারীপুরে রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর, বরিশালে প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো দুর্গামন্দির ভেঙে ফেলার অভিযোগ, কুমিল্লায় প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো কালীমন্দির ধ্বংস, গোপালগঞ্জে দুটি মন্দিরে অগ্নিসংযোগ, সিলেটে গৌর-নিতাই মন্দিরে আগুন এবং ফরিদপুর, খুলনা ও নীলফামারীতে কালীমূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, এসব হামলা শুধু ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত নয়; বরং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব এবং সামষ্টিক নিরাপত্তাবোধের ওপর আঘাত।
জমি দখল ও অর্থনৈতিক চাপ
সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে জমি দখল, ফসল নষ্ট, বাড়িঘরে হামলা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের ঘটনাও ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। কক্সবাজার, রংপুর, নেত্রকোনা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি দখলের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
HRCBM বলছে, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া এবং জমি থেকে উচ্ছেদ করার মাধ্যমে সংখ্যালঘু পরিবারগুলোকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সহিংসতার সঙ্গে প্রায়ই জমি দখল, ব্যবসা ধ্বংস, লুটপাট এবং কৃষিজমি নিয়ে বিরোধ জড়িত ছিল।
সংগঠনটির মতে, এই ধরনের অর্থনৈতিক নিপীড়ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও টিকে থাকার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
নারী ও শিশুদের বাড়তি ঝুঁকি
প্রতিবেদনে সংখ্যালঘু নারী ও শিশুদের ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ২৮টি যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

অনেক ঘটনায় স্কুলগামী ছাত্রী, কলেজ শিক্ষার্থী ও তরুণীদের অপহরণ, নিখোঁজ হওয়া, জোরপূর্বক বিয়ে এবং ধর্মান্তরের অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনা নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, শারীরিক স্বাধীনতা এবং বিচার পাওয়ার অধিকার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এছাড়া প্রবীণ ব্যক্তি, বিধবা নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীকেও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল ও অন্যান্য এলাকায় চাকমা, ত্রিপুরা ও ম্রো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
বিচারহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার অভিযোগ
প্রতিবেদনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ। HRCBM বলছে, অনেক ঘটনায় পুলিশি তদন্তে বিলম্ব, যথাযথ মামলা না হওয়া, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণে ব্যর্থতা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংগঠনটির দাবি, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা চালিয়ে যেতে ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়েছে। কিছু ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার বা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
প্রতিবেদনটি বলছে, এই ধরনের দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, অবিশ্বাস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও গভীর করেছে।
দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতা
HRCBM বর্তমান পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘুরা সহিংসতা, উচ্ছেদ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
সংগঠনটির দাবি, বাংলাদেশের সামগ্রিক জনসংখ্যা বেড়ে গেলেও সংখ্যালঘুদের জনসংখ্যার হার ক্রমাগত কমেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪৬ সালে যেখানে সংখ্যালঘুর হার প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল, তা ২০২০ সালে ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
HRCBM-এর মতে, এই পরিবর্তন কেবল স্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের ভয়ভীতি, সহিংসতা, জমি দখল ও দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক নজরদারির আহ্বান
প্রতিবেদনটি প্রস্তুতে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, হাসপাতালের নথি, পুলিশ ডায়েরি, সংবাদ প্রতিবেদন এবং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে HRCBM।
সংগঠনটি বাংলাদেশ সরকার, বিচার বিভাগ, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলোর প্রতি সংখ্যালঘু সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, কার্যকর তদন্ত, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং স্বাধীন নজরদারি ছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও উচ্ছেদের এই চক্র অব্যাহত থাকবে।
HRCBM- Report 2026
– অনুবাদ ও সারসংক্ষেপ ওটিএন বাংলা