নিজ এলাকার জন্য রাজস্ব তহবিল থেকে ২৫ কোটি টাকা নিয়েছেন আসিফ-হাসনাত
মেলবোর্ন, ৩১ মে- কুমিল্লা জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক…
মেলবোর্ন, ৩০ মে: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলা, নির্যাতন, সামাজিক হয়রানি, চাকরি থেকে অপসারণ এবং হত্যার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকারকর্মী ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর দাবি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছেন।
সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের মতে, ৫ আগস্টের পর খুলনা, লালমনিরহাট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মন্দির, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর হামলার পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে চাপ সৃষ্টি, সামাজিক বয়কট এবং চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে। তাদের অভিযোগ, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ, যার ফলে বহু পরিবার আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সমগ্র বাংলাদেশজুড়ে সংঘটিত সহিংসতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। তথ্যচিত্রটিতে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আলোকে ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।
সংখ্যালঘু অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা দাবি করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সৃষ্ট অস্থির পরিস্থিতির সুযোগে উগ্রবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও একাধিক অনুষ্ঠানে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “মুখে সম্প্রীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দৈনিক প্রথম আলো জানায়, ৫ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ১,০৬৮টি ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয়েছে। একই সময়ে ২২টি উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে ৫ ও ৬ আগস্ট। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাড়ি, দোকান ও ধর্মীয় উপাসনালয় ছিল। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৫০টিরও বেশি জেলায় দুই শতাধিক হামলার ঘটনা সংঘটিত হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে অন্তত ২৯৫টি বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়।
এছাড়া:
বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা ৪৯টি জেলায় হামলার তথ্য সংগ্রহ করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর প্রায় অর্ধেক সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
হামলার ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও সামনে আসে। বাগেরহাটের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মৃণাল কান্তি চ্যাটার্জি ৫ আগস্ট রাতে হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। খুলনার পাইকগাছার স্বপন কুমার বিশ্বাসও হামলার পর মৃত্যুবরণ করেন।
অনেক পরিবার নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। স্থানীয় পর্যায়ে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজ করে।
২০২৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে একাধিক ঘটনা আলোচনায় আসে। খুলনায় কলেজছাত্র উৎসব মণ্ডলকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হতে হয়। পরে তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
একইভাবে ফরিদপুরের হৃদয় পাল, লালমনিরহাটের পরেশ চন্দ্র শীল ও তার ছেলে বিষ্ণু চন্দ্র শীলকে ঘিরেও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অভিযুক্তদের পরিবার অভিযোগ করে যে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই জনরোষ ও সামাজিক চাপের মুখে তারা চরম ভোগান্তির শিকার হন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সংখ্যালঘুরা বারবার হামলার শিকার হয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের হামলার পেছনে শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও কাজ করে, যার ফলে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
২০২৪ সালের শেষ দিকে জাতীয় পতাকার অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেফতার করা হয়। তার গ্রেফতারির পর চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম আদালত এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম নিহত হন। ঘটনাটি বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও প্রবাসী সংগঠন ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, সিডনি ও পার্থে একযোগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও বৈষম্যের প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর মেলবোর্ন, সিডনি ও পার্থে একযোগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনোরিটিস ইন বাংলাদেশ (AFERMB)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
ছবি: AFERMB
অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনোরিটিজ ইন বাংলাদেশ (AFERMB)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গ্রেফতার ব্যক্তিদের আইনি অধিকার রক্ষা এবং হামলার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশী কমিউনিটির সদস্যরা চট্টগ্রামের হাজারী লেনে ‘হামলা’, সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণদাস ব্রহ্মচারীসহ অন্যান্য ব্যক্তিদের গ্রেফতার, তাঁদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা এবং চিন্ময় ব্রহ্মচারীর জামিন নাকচ হওয়ায় বিক্ষোভ করে। এই বিক্ষোভে অবিলম্বে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীসহ গ্রেফতারকৃত সকল সংখ্যালঘুর নিঃশর্ত মুক্তি, তাঁদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহার এবং সকল হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করা হয়।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচিত হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার নিন্দা জানান এবং পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তার মন্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রশ্নটি নতুন করে বৈশ্বিক আলোচনায় উঠে আসে।
মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর মতে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনের শাসন বজায় রাখতে হলে হামলার অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময় তাই শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার ইতিহাস নয়; বরং নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী নির্মাতা কৃষ্ণ দে আকাশের পরিচালনায় নির্মিত এই ডকুমেন্টা

বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর মব হামলা ও লুটের তীব্র নিন্দা জানান সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রির প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হয়েছে। নির্মাতার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্দেশ্য হলো ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাবলির একটি নথিভুক্ত চিত্র তুলে ধরা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছে দেওয়া।
ডকুমেন্টারি নির্মাণে সহযোগিতা করেছে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক মানবাধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংগঠন Australian Federation for Ethnic and Religious Minorities in Bangladesh (AFERMB)। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
ডকুমেন্টারিটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au