নিজ এলাকার জন্য রাজস্ব তহবিল থেকে ২৫ কোটি টাকা নিয়েছেন আসিফ-হাসনাত
মেলবোর্ন, ৩১ মে- কুমিল্লা জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক…
মেলবোর্ন, ৩০ মে- বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আয়োজিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে আয়োজক সংগঠন। তানিম নূর পরিচালিত আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শন ঘিরে কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক, ধর্মীয় সংগঠনগুলোর আপত্তি এবং সম্ভাব্য উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শনিবার নির্ধারিত প্রদর্শনী বাতিল করা হয়। বিষয়টি নিয়ে জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
আয়োজক সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি জানিয়েছে, প্রদর্শনী পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি। আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে পরে নতুন তারিখে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শনিবার বিকেল ৩টায় জেলা শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের হলরুমে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে অনুষ্ঠান ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তারা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কোনো অনুমতি দেয়নি। অন্যদিকে আয়োজকদের দাবি, তারা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুমতি নিয়েই প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি মূলত জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সংগঠনটি ‘ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা’ শিরোনামে নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্রবিষয়ক আলোচনা আয়োজন করে আসছে। ঈদ উপলক্ষে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু প্রদর্শনীর ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিরোধিতা শুরু হয়। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতাকর্মীরা ফেসবুকে একাধিক পোস্ট দিয়ে প্রদর্শনী বন্ধের দাবি জানান। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এ নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে।
জেলা কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা হাফেজ নাসুরুল্লাহ মুয়াজ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর প্রচারপত্রে লাল ক্রস চিহ্ন দিয়ে একটি পোস্ট প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লেখেন, এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এরপর শুক্রবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় জেলা কওমী ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জেলার শীর্ষ আলেমদের নির্দেশনায় আয়োজিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন কওমী ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা এবং জেলা হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আলী আযম কাসেমী।
সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইসলামবিরোধী ও অশ্লীল সংস্কৃতি বিস্তারের চেষ্টা করছে। তাঁদের দাবি, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর নামে এমন কার্যক্রম জেলার ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বৈঠকে উপস্থিত নেতারা প্রদর্শনী প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আলেম সমাজের পক্ষ থেকে শনিবার জোহরের নামাজের পর জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় শান্তিপূর্ণ সতর্কতামূলক অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এতে স্থানীয় আলেম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আয়োজকরা স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির সদস্য এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তওজা খন্দকার জানান, তারা শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে আশ্বাস দেন।
তওজা খন্দকার বলেন, প্রদর্শনী নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় অনুষ্ঠান স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।
ফিল্ম সোসাইটির উপদেষ্টা মোহাইমিনুল আজবীন বলেন, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার শাহরিয়ারসহ কয়েকজন সদস্য অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং লিখিত আবেদন জমা দেন। তাঁদের দাবি, প্রধান শিক্ষক আবেদন গ্রহণ করেন এবং মৌখিকভাবে অনুমতিও দেন।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে এসে একটি পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে হলরুম ব্যবহারের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হবে, এমন কোনো তথ্য তাঁকে জানানো হয়নি। এ ধরনের কোনো কার্যক্রমের জন্য তিনি লিখিত বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেননি বলেও দাবি করেন।
অন্যদিকে জেলা হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আলী আযম কাসেমী বলেন, বিষয়টি শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা ফখরে বাঙাল তাজুল ইসলাম (রহ.)-কে নিয়েও কিছু মন্তব্য করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তিনি বলেন, জেলার আলেম সমাজ ও কওমী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেখান থেকেই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হয়।
ঘটনাটি ঘিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর দাবি, চলচ্চিত্র প্রদর্শন একটি স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম; অন্যদিকে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর একটি অংশ মনে করছে, এ ধরনের আয়োজন স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফলে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া এই বিতর্ক এখন জেলার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আপাতত প্রদর্শনী স্থগিত থাকলেও ভবিষ্যতে এটি নতুন করে আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au