অস্ট্রেলিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ অস্ট্রেলিয়া, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে?

  • 4:54 pm - June 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬৫ বার
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৪ জুন- অস্ট্রেলিয়ার পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের মার্কিন পরিকল্পনা ঘিরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, জোরপূর্বক শ্রম ও আধুনিক দাসপ্রথার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে অস্ট্রেলিয়া যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানি পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। এর জবাবে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিরও পরিপন্থী। তিনি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ‘আদর্শগত মতপার্থক্য’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে যে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশের ওপর নতুন করে আমদানি শুল্ক আরোপ করা হবে। এই তালিকায় অস্ট্রেলিয়াও রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, যা বর্তমানে কার্যকর থাকা ১০ শতাংশ অস্থায়ী বৈশ্বিক আমদানি সারচার্জের চেয়েও বেশি। উল্লেখ্য, ওই অস্থায়ী শুল্ক আগামী জুলাই মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে যে মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, বর্তমান প্রশাসন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তিনি বলেন, বহু দশক ধরে একটি সাধারণ অর্থনৈতিক ধারণা ছিল যে শুল্ক আরোপ কোনো দেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। কারণ এতে সংশ্লিষ্ট দেশের ভোক্তাদেরই বেশি দামে পণ্য ও সেবা কিনতে হয়। তার মতে, মুক্ত বাণিজ্য বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষা করে এবং অযথা শুল্ক আরোপ সেই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প । ছবিঃ সংগৃহীত

আলবানিজ আরও বলেন, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের মিত্র। দুই দেশের মধ্যে কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার ওপর নতুন শুল্ক আরোপের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি অভিযোগ করেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অস্ট্রেলিয়াকে কোনো পূর্বাভাস বা আনুষ্ঠানিক সতর্কতাও দেওয়া হয়নি, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার অবশ্য দাবি করেছেন, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে মার্কিন শ্রমিকরা বৈশ্বিক বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তার মতে, এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে মার্কিন শ্রমিকদের অন্যায্য সুবিধা পাওয়া বিদেশি উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।

এদিকে প্যারিসে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার বৈঠকের ফাঁকে অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডন ফ্যারেল জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত শুল্ক আরোপ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং তা প্রত্যাহার করা উচিত।

প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ বলেন, জোরপূর্বক শ্রম ও আধুনিক দাসপ্রথা মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়ার আইন বিশ্বের অন্যতম কঠোর আইন হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব আইন দেশটির পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় জোরপূর্বক শ্রমের উপস্থিতি শনাক্ত ও প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও অতীতে স্বীকার করেছেন যে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত রয়েছে। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে যত পণ্য আমদানি করে, তার চেয়ে কম পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের অর্থনৈতিক ভিত্তিও দুর্বল বলে মনে করেন তিনি।

আলবানিজের মতে, এই শুল্ক আরোপের ফলে মূল ক্ষতির শিকার হবেন মার্কিন ভোক্তারাই। কারণ আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং এর প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করবে।

অস্ট্রেলিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলরও মার্কিন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মিত্র। সেই দেশের পক্ষ থেকে এমন শুল্ক আরোপ করা উচিত নয়। তিনি এ সিদ্ধান্তকে ‘খারাপ’ ও ‘অন্যায্য’ বলে উল্লেখ করে বলেন, অস্ট্রেলিয়া এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক অর্থমন্ত্রী জো হকি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ তাকে বিস্মিত করেনি। তার মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপকারী। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে বহুবার আলোচনা করলেও প্রেসিডেন্টকে অবস্থান পরিবর্তনে রাজি করাতে পারেননি।

জো হকি বলেন, ট্রাম্প এখনও উপলব্ধি করতে পারছেন না যে শুল্কের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের ওপর। তিনি মন্তব্য করেন, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির এক অদ্ভুত বাস্তবতা হলো, একজন বামঘেঁষা লেবার প্রধানমন্ত্রী এখন একজন ডানপন্থী রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টকে মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা বোঝানোর চেষ্টা করছেন।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার দাসপ্রথাবিরোধী কমিশনার ক্রিস ইভান্স ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেছেন, দাসশ্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার মতে, আধুনিক দাসপ্রথা একটি গুরুতর মানবাধিকার সমস্যা। কিন্তু এটিকে শুল্ক আরোপের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা দুঃখজনক।

তবে তিনি স্বীকার করেন, অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক দাসপ্রথা প্রতিরোধ আইন আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। বর্তমানে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় জোরপূর্বক শ্রমের প্রমাণ পেলে তা জানাতে বাধ্য হলেও আইনগতভাবে তাদের তা বন্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা হয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন শুল্ক আরোপের এই উদ্যোগ শুধু অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেই নয়, বরং বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সূত্রঃ এবিসি নিউজ

এই শাখার আরও খবর

বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার সংকট কেন কাটছে না?

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই—বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের সমষ্টি হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা কঠিন। দীর্ঘদিনের…

হামলায় এক পা হারালেন অস্ট্রেলীয় এমপি হেলেন হেইনস, অবস্থা সংকটাপন্ন

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ায় নিজ নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে গাড়ি দিয়ে চালানো উদ্দেশ্যমূলক হামলায় এক পা হারিয়েছেন স্বতন্ত্র ফেডারেল সংসদ সদস্য হেলেন হেইনস। অস্ত্রোপচারের পরও…

ভিক্টোরিয়ায় এমপি হেলেন হেইনসকে গাড়িচাপা: আটক চালককে জিজ্ঞাসাবাদ, হামলার উদ্দেশ্য খুঁজছে পুলিশ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে নিজ নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে গাড়ির আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন স্বতন্ত্র ফেডারেল সংসদ সদস্য হেলেন হেইনস। এ ঘটনায় আটক ৪৩…

রাষ্ট্রপতির মন্তব্যে হেফাজতের তীব্র প্রতিবাদ, বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ইসলামের মৌলিক তাওহিদি বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক…

পূজায় নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, অংশ নিলে ঈমান থাকবে না: বায়তুল মোকাররমের খতিব

দেশে বসবাসরত অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতী আব্দুল মালেক। তবে উদারতা বা…

ঋণ করে বিদেশে পাঠানো ছেলের মৃত্যুদণ্ড, বিচার ও মরদেহ ফেরত চান বাবা

সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে নজরুলের বাবা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au