সেলিনা হায়াৎ আইভী।ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ জুন- বিএনপি সরকার সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেন জামিন দিলো? হ্যাঁ, বাংলাদেশে আদালত জামিন দেয় না, জামিন দেয় যারা সরকারে থাকে। তো, আইভীকে কেন তারা জামিন দিলো? আইভীকে দিয়ে তারা রিফাইন আওয়ামী লীগ বানাবে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে? এরকম আওয়ামী লীগ কি বাংলাদেশে কোন গ্রহণযোগ্যতা আছে? আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মী হচ্ছে শেখ হাসিনার অন্ধ ভক্ত। আওয়ামী লীগের ভোটাররাও শেখ হাসিনার প্রতি একই রকম অনুসারী। যে কারণে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আইভী, সাবের, শিরিন শারমিন- তাদেরকে দিয়ে নতুন আওয়ামী লীগ বানানোর কোন সরকারী চেষ্টা বা ডিপস্টেটদের পরিকল্পনা সফল হওয়ার বাস্তবতা নেই। এটি কি আইভী বা সাবের জানে না? আপনাদের চাইতে অনেক ভালো করে জানে। তাহলে আইভীকে কেন সরকার মুক্তি দিলো?
আমার ধারণা জামাতকে ঠেকাতে! জামাতের কাছে বিএনপি মাঠের রাজনীতিতে হেরে বসে আছে। বিএনপির কোন সাংঘঠনিক শক্তি নেই জামাতকে মোকাবিলা করতে পারে। একটাও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিবিরকে সরিয়ে ছাত্রদল তাদের পজিশন নিতে পারেনি। স্থানীয় রাজনীতিতে জামাত শিবিরের নেতাদের যে দাপট সেটি কোন বিরোধী দলের থাকে না। দেশে বিএনপি সরকারী দল সেটি দেখে মনে হয় না। আগামী স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে, সিটি ও পৌর নির্বাচনে, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গ্রাম পর্যায়ের যত স্থানীয় নির্বাচন আছে সেখানে জামাত তার সাংঘঠনিক শক্তিতে বিএনপিকে নাস্তানাবুত করে ফেলবে। ফলে বিএনপি চাইছে আওয়ামী লীগ বেনামে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাঠের রাজনীতিতে আসুক। গোপন আঁতাতে আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপি চাইবে, জামাত ঠেকাতে বিএনপি স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ভোট দিবে- এই রকম একটা চিন্তা হয়ত চলছে। শেখ হাসিনা তো বলেই দিয়েছেন, আগামী সমস্ত স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিবে, স্বতন্ত্র পরিচয়ে, ভিন্ন পরিচয়ে যেভাবেই হোক নির্বাচন করতে হবে। আইভী মুক্তির পর পরই আগামী সিটি মেয়র নির্বাচনে লড়াই করার ঘোষণাটা এ জন্যই এসেছে। যতটুকু জানি, নারায়ণগঞ্জ, গাজিপুর, সিলেট পুরোটাই এখন জামাতের কন্ট্রলে। বিএনপি এখানে সাংঘঠনিকভাবে দুর্বল। পক্ষান্তরে এখানে আওয়ামী লীগ তার শক্তিশালী তৃণমূল ও জনসমর্থন নিয়ে নিরব হয়ে আছে শুধু রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়ে নেতৃত্বের অভাবে। আইভীর মুক্তি এই প্রথম আওয়ামী লীগ তার একজন নেতৃত্বকে ফিরে পেয়েছে। ব্যারিস্টার সুমন মুক্তি পাবেন তেমনটাই শোনা যাচ্ছে। এটাও জামাত ঠেকানোর মড়িয়া চেষ্টা হতে পারে।
এই যে আমি বিশ্লেষণগুলো করলাম সবটাই ধারণা। বিশ্লেষণ মানেই ধারণা। যদি আমার বিশ্লেষণ আপনি মানতে না পারেন তাহলে বিএনপি সরকারের যেচে আইভীকে মুক্তির মানে যদি আপনি মনে করেন আইভীকে দিয়ে আওয়ামী লীগ ভাঙনের চেষ্টা করা হবে তাহলে সেটার সত্যতা জানতেও আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুটা সময়।
আমাদের সৌভাগ্য যে তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কেউ ফেইসবুকের আওয়ামী লীগ এক্টিভিস্টদের মত করে চিন্তা করে না। যারা মাঠের রাজনীতি করে তারা স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে লিঁয়াজো করে নিজেদের মাঠ প্রস্তুত করতে সন্ধি করছে। ফেইসবুক লীগের যুক্তিতে তারাও লাল বদর? রাজনীতি করা আর ফেইসবুকে একে তাকে লাল বদর ট্যাগ মারা ভিন্ন জিনিস। লেখালেখি করি বলে তৃণমূলের আওয়ামী লীগের মাঠের অনেক কর্মীর মেসেজ আমি পাই। একমাত্র তারাই জানে কতটা কঠিন হয়ে গেছে এখন আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতিটা! ফতোয়াবাজ মোল্লাদের মত খালি লাল বদর ফতোয়া দিয়ে দিলেই আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতির মাঠ প্রস্তুত হবে? এরা শেখ হাসিনাকেও কোনদিন লাল বদর বলে দিবে! যখন হাসিনা কৌশলগত কারণে সরকারের সঙ্গে তৃণমূলকে দিয়ে আপোষ করাবে। কি, কথাটা শুনে চ্যাতে উঠেছেন? না, আমার নেত্রী খাম্বার কাছে মাথা নত করবে না! শেখ হাসিনা এই উপমহাদেশের জীবিতদের মধ্যে যে কয়েকজন ট্যালেন্টেড রাজনীতিবিদ আছে তাদের একজন। কাজেই তিনি জানেন রাজনীতিতে কখনো কখনো শত্রুর গালেও চুমু খেতে হয়। ভাই ফেইসবুক লীগ, জানেন কি লীগের ফেরাটা কঠিন কেন?
আপনারা কি ইদানিংকালের প্রথম আলোর শিরোনামগুলো দেখছেন? তারা কেন বারবার লীগের ফেরার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছে, জনগণের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করতে চাচ্ছে? কারণ লীগের ফেরা মানে এক দশক পর হলেও এই প্রথম আলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অস্তিত্ব হারাবে। বদিউল আলম মজুমদার ফ্রড মযহার যদি বয়স না পায় তাদের উত্তরসুরীর কারোর অস্তিত্ব বাংলাদেশে থাকবে না। গ্রামীণ ব্যাংক বলতে কিছু থাকবে না। ইনুস বয়স না পেলেও তার মরণোত্তর নাগরিত্ব বাতিল হবে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে। ফ্যাসিস্ট নির্মূলের নামে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধ নির্মূলকারীদের কেউ নিজেদের পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ মনে করে না। ২১ বছর পর যে দল নির্বাচন করে ক্ষমতায় গিয়ে ৭১ ও ৭৫ এর খুনিদের ফাঁসিতে ঝুঁলাতে পারে তাদের সম্পর্কে এই ভয় সবাই পাবেই। শেখ হাসিনা বয়স না পেলেও তার রেখে যাওয়া দায়িত্ব তার উত্তরাধিকাররা সব পাওনা মিটিয়ে দিবে!
তৃণমূল আওয়ামী লীগের জন্য সুখবর যে তারা কোন আওয়ামী ‘পিনাকী’ ধরেনি। বিএনপি যেমন পিনাকীর ইউটটিউব শুনে তৃণমূল রাজনীতির ভাষ্য তৈরি করত, আওয়ামী লীগের তৃণমূল আওয়ামী লীগের হয়ে ইউটিউব ফেইসবুকে গলা ফাটায় এমন কাউকে পীরবাবা মেনে নেয়নি।
বরং তারা উল্টোটাই করছে। যখন যেখান থেকে তারা তাদের রাজনীতির জন্য সুফল মনে করছে সেটাকেই ক্যাশ করছে। আব্দুর নূর তুষার, সাংবাদিক পান্না, আনিস আলমগীর, নবনীতা চৌধুরী, সুলতানা রহমান, মাহবুব আজিজ, মাসুদ কামাল… এই সময়ে এদের জুলাইয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতা, ইনুসের দেশ বিরোধীতা, তাদের ফ্যাসিবাদী আচরণের বিরুদ্ধে সাহসী বক্তব্যগুলোকে তারা ক্যাশ করছে। তাদের কে লাল বদর ছিল এটি খোঁজা আজাইরা ফেইসবুক লীগের কাজ। আওয়ামী লীগের দরকার তাদের অনুকূলের মাটি, ফেইসবুক লীগের দরকার ভিজুয়াল লীগের দখল। তাদের এমন ভাব তারা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য! শেখ হাসিনা কি এদের কথায় চলে? চলে না বলেই স্বস্তির। তৃণমূল আওয়ামী লীগ এদের কথা কানে তুলে না বলেই স্বস্তির। কে লাল বদর তার চাইতে জরুরী তার একটি কথায় আমার লাভ কতটুকু সেটিকে ক্যাশ করা। এটাই রাজনীতি। সেই রাজনীতিটাই হচ্ছে মনে হয় আমার। কাজেই আমি আশাবাদী যে ফ্যাসিবাদ জামাত শিবির কায়েম করেছে তা ভেঙে কৌশলে আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে।
লেখক- সুষুপ্ত পাঠক