ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর উভয় দেশই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একাধিক প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব বিনিময় করেছে। তবে একই সময়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য, সামরিক তৎপরতা এবং সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং যে কোনো সময় নতুন করে সংঘাত শুরু হতে পারে।
শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক হামলায় ব্যবহৃত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে তেহরান বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার পর এই সতর্কবার্তা দেন তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দেশটির নৌবাহিনী ওমান উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজের দিকে সতর্কতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ সৃষ্টি, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা এবং তেলের ট্যাংকার আটকে রাখার অভিযোগও তুলেছে তেহরান।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবিঃ সংগৃহীত
এদিকে যুদ্ধবিরতির পরও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, গত বুধবার কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়। এতে কয়েকজন আহত হন এবং বিমানবন্দরের কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার কারণে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখতে এবং কয়েকটি ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করতে হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই ঘটনায় একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম দাবি করেছে, কুয়েতমুখী ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করা হয় এবং বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এই অঞ্চলের একটি দেশে অবস্থানরত মার্কিন হেলিকপ্টারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। প্রতিবেদনে দেশটির নাম উল্লেখ না করা হলেও কুয়েতকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাহরাইনে অবস্থিত একটি বিমানঘাঁটি এবং মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরের দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের দাবি করেছে আইআরজিসি।
অন্যদিকে সেন্টকম জানিয়েছে, বাহরাইনের দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও মাঝপথে প্রতিহত করা হয়েছে এবং কুয়েত বা বাহরাইনে কোনো মার্কিন সেনা কিংবা সামরিক সম্পদের ক্ষতি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প । ছবিঃ সংগৃহীত
সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত হয় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক হামলার পর। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গোরুক ও কেশম দ্বীপে অবস্থিত রাডার এবং ড্রোন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এছাড়া কেশমের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারেও হামলা করা হয়। মার্কিন বাহিনী কয়েকটি ইরানি ড্রোনও ভূপাতিত করে, যেগুলো বেসামরিক জাহাজে হামলার চেষ্টা করছিল বলে ওয়াশিংটনের দাবি। এসব ঘটনার জবাব হিসেবেই ইরান সাম্প্রতিক পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
তেহরান আরও অভিযোগ করেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি তেলের ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘পানায়া’ নামের একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে। যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই স্থিতিশীলতাকে আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গত ১৭ মে আবুধাবি কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি ড্রোন হামলার ফলে বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার বাইরে একটি বিদ্যুৎ জেনারেটরে আগুন লাগে। যদিও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাও স্বাভাবিক ছিল।
এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করে, ফুজাইরাহ বন্দরে ইরান একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ওই ঘটনায় তিন ভারতীয় নাগরিক আহত হন এবং একটি তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়।
তবে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসকে জানান, ইরান যদি সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে রাজি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করবে। তিনি আরও বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আগের চেয়ে বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছেন।
৬ মে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান একটি চুক্তি করতে আগ্রহী এবং দুই পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। তাঁর ভাষায়, খুব শিগগিরই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে পাকিস্তানও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। শুক্রবার সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এবং ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনির মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসমাইল বাঘাই। ছবি : সংগৃহীত
গত মে মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফর করেন এবং ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সফরকে কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এরপর ২৮ মে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন সূত্র জানায়, দুই দেশ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো এবং স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যেতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে এখনো কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে নিশ্চিত করেনি।
এদিকে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থানও কঠোর। বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছেন, ইরানের হামলায় কোনো মার্কিন সেনা নিহত হলে তিনি যুদ্ধবিরতি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো চুক্তি করবে না যা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চায় না, তবে প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
অন্যদিকে ইরানও কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে টানা ৪০ দিন টিকে থাকা সহজ বিষয় নয়। তিনি পুনরায় সতর্ক করে বলেন, ইরানে হামলার জন্য ব্যবহৃত মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
এছাড়া ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা বন্ধ করে সরাসরি যুদ্ধের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে এক ধরনের অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন অভিযান এবং পাল্টাপাল্টি হুমকি নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত শান্তির পথে এগোবে, নাকি আবারও যুদ্ধের দিকে ফিরে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্রঃ আল জাজিরা