আইডিএফ-এর প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়েল গ্রসম্যান। ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৭ জুন- ভবিষ্যতের যুদ্ধকে সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মহাকাশ প্রযুক্তি, সাইবার যুদ্ধ, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং ইলেকট্রনিক স্পেকট্রাম সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। বাহিনীর প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়েল গ্রসম্যান জানিয়েছেন, অতীতের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আগামী দিনের সংঘাতের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সামরিক সক্ষমতা নতুনভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়েল গ্রসম্যান বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব চলছে এবং আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে তথ্য, নজরদারি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। তাই শুধু প্রচলিত সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের জন্য আইডিএফকে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামোয় সংগঠিত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইডিএফ প্রধান ইয়াল জামির ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদি সামরিক পরিকল্পনায় মহাকাশ প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গ্রসম্যানের ভাষায়, শক্তিশালী মহাকাশ কৌশল ছাড়া ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। সে লক্ষ্যেই স্যাটেলাইট যোগাযোগ, মহাকাশভিত্তিক নজরদারি এবং নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
আইডিএফের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুনে পরিচালিত অভিযানে ইরানের প্রায় ১২ হাজার স্থাপনার ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের সংঘাতে সেই সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই বিপুল তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে উন্নত স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে দাবি করেছে বাহিনী।
গ্রসম্যান বলেন, ইসরায়েলের সীমান্ত থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পরিচালিত বিমান অভিযানের সফলতার অন্যতম ভিত্তি এখন উন্নত স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ডেটা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে একাধিক নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও জানান, রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দেশগুলো মহাকাশে স্যাটেলাইট ধ্বংস বা অকার্যকর করার প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে। এ কারণে মহাকাশভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এ খাতে কাজ চলছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আইডিএফ তাদের সাইবার ও যোগাযোগ কাঠামো পুনর্গঠন করে এআই-কেন্দ্রিক নতুন ব্রিগেড ‘স্ফেইরা’ এবং সম্প্রসারিত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ইউনিট গঠন করে। এই ইউনিটগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে।
আইডিএফের দাবি, ২০২৫ সালে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় ইসরায়েলের দিকে ছোড়া প্রায় ১ হাজার ১০০ ড্রোনের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছিল তাদের ৫১১৪তম স্পেকট্রাম ওয়ারফেয়ার ব্যাটালিয়ন। বাহিনীর মতে, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ছিল ওই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আলোচিত অধ্যায়।
গ্রসম্যান জানান, আইডিএফ বর্তমানে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে বিমান বাহিনী, সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ এবং স্থলবাহিনীর তথ্য একত্রিত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকেও সীমান্তসংলগ্ন এলাকার মতো দ্রুত শনাক্ত ও আঘাত করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার প্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ভবিষ্যতের যুদ্ধের চিত্র পাল্টে দেবে। তাই ২০২৬ সালের যুদ্ধ নয়, বরং ২০৩৫ সালের সম্ভাব্য যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই বর্তমান পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
আইডিএফ আরও জানিয়েছে, গাজা ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন ধরনের ড্রোন ও আধুনিক অস্ত্র মোকাবিলার কৌশল তৈরি করা হচ্ছে। তবে তারা স্বীকার করেছে, এফপিভি ড্রোনের মতো নতুন হুমকির বিরুদ্ধে এখনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়নি এবং এ সক্ষমতা অর্জনে আরও সময় লাগবে।
আইডিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতার সমন্বয় ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরায়েলকে কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে। একই সঙ্গে বাহিনীর বহু প্রযুক্তি ইউনিটকে ধাপে ধাপে বেয়ারশেবার নতুন প্রযুক্তি ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।