২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ ছিলেন মো. সুমন। পরে তুরাগ নদে মেলে তাঁর লাশ। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৮ জুন- ঢাকার তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। তারা হলেন মো. সুমন (১৭), আরিফ হাসান রাকিব ও রনি মোল্লা (৩৫)। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুরাগ নদে সাতজনের মরদেহ উদ্ধারের যে দাবি প্রচার করা হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।
সবশেষ শুক্রবার (২৬ জুন) আশুলিয়া থানা এলাকার তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় মো. সুমনের অর্ধগলিত মরদেহ। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুন পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি। পরদিন থেকে স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করলেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন।
শনিবার দুপুরে রানাভোলায় সুমনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সন্তান হারানোর শোকে পরিবারের সদস্যরা বাকরুদ্ধ। স্বজনরা জানান, ছেলের মৃত্যুর শোক আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে ভেবে তার মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলা হয়েছে, মোবাইলে থাকা সব ছবি মুছে দেওয়া হয়েছে এবং বাসায় থাকা ছবিগুলোও সরিয়ে রাখা হয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সুমন কামারপাড়া এলাকার একটি কাঁচামালের আড়তে কাজ করতেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি আইডিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিডিও পাওয়া গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, স্থানীয়দের খবরের ভিত্তিতে ২৫ জুন রাতে আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা সেটি সুমনের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন সাঁতার জানতেন না এবং নদীতে পড়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন।
এর আগে ২৪ জুন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ। তিনি ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যরা জানান, ২২ জুন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পরে নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
রাকিবের চাচা আরশাদুল ইসলাম বলেন, মৃত্যুর আগে পরিবারের কেউ জানতেন না যে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু ছবি ও ভিডিও দেখে বিষয়টি জানতে পারেন তারা। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবার নিশ্চিত নয়। নিয়ম অনুযায়ী একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে এবং রংপুরে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
একই দিনে তুরাগ নদের দিয়াবাড়ী এলাকায় গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান রনি মোল্লা (৩৫)। আমিনবাজার নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক হুমায়ুন কবির জানান, রনিকে সঙ্গীরা উদ্ধারের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত অবস্থায় তীরে তোলা হয়।
রনির বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা জানান, তার ছেলে উত্তরার একটি হোটেলে কাজ করতেন। ঘটনার দিন সকালে কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার পর গোসল করতে গিয়ে তিনি ডুবে যান। তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাতজনের মরদেহ উদ্ধারের যে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে, তা নাকচ করে বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে এবং বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
একই বক্তব্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। তারা জানিয়েছে, মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
এদিকে তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস, নৌ-পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, ২২ জুনের পর এখন পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে মোট তিনটি মরদেহ উদ্ধারের তথ্যই তাদের কাছে রয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়নি।