ইউরোপের পোশাক বাজারে চাপে বাংলাদেশ। ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন,১ জুলাই- ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তৈরি পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে পরিচিত এই বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়, বাজার অংশীদারিত্ব এবং পণ্যের গড় মূল্য তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। অন্যদিকে ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বা আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের ৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ইউরো থেকে প্রায় ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ কম। একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে প্রায় দ্বিগুণ হারে।
এর ফলে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে এত বড় বাজার অংশীদারিত্ব আর কোনো দেশ হারায়নি।
অন্যদিকে ভারতের রপ্তানি কমলেও সেই পতনের হার ছিল মাত্র ১২ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে দেশটি ইউরোপীয় বাজারে নিজেদের অবস্থান অনেকটাই ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে অগ্রগতি, ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈচিত্র্যময় শিল্পভিত্তি, উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর “চায়না প্লাস ওয়ান” কৌশলের কারণে ভারত ক্রেতাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
চীনও ইউরোপের বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চীনের রপ্তানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে দেশটির বাজার অংশীদারিত্ব ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক ও বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চীনা রপ্তানিকারকেরা ইউরোপে আরও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যনীতি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা, দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা ও আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থাও তাদের এগিয়ে রেখেছে।
ভিয়েতনামও ইউরোপের বাজারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। চার মাসে দেশটির রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। বরং নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। এর ফলে ভিয়েতনামের বাজার অংশীদারিত্ব ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইভিএফটিএ), উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দ্রুত ডেলিভারি সক্ষমতা ভিয়েতনামকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুধু রপ্তানির পরিমাণই কমেনি, কমেছে পণ্যের গড় রপ্তানি মূল্যও। চার মাসে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১৫ দশমিক ৫৯ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে নেমে এসেছে। ফলে রপ্তানিকারকদের কম অর্ডারের পাশাপাশি কম দামেও পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যাও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব, বন্দরের জট, দীর্ঘ লিড টাইম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে শুধু অর্ডার কমে যাওয়া নয়, ইউনিট মূল্য কমে যাওয়াও বড় কারণ। তিনি মনে করেন, উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং উচ্চমূল্যের মূল্যসংযোজনকারী পণ্যের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, চীন সরকারিভাবে রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং ব্যাংকিং সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত অর্থায়ন পায়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগীদের মতো মূল্যছাড় দেওয়ার সক্ষমতাও অনেক কারখানার ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৯ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না। তখন ভারত, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া জরুরি। অন্যথায় গত তিন দশকে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশ যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, তার একটি বড় অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।