জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মামলার রায় ঘিরে তীব্র বিতর্কের জন্ম—রাজনৈতিক ইতিহাস, বিচারিক প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। ছবি: CC BY
মেলবোর্ন, ১ জুলাই: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পুরো কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ এই রায় ঘোষণা করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ঘোষিত রায় নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে কিছু প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়, যেখানে অন্য কয়েকটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনায় মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়। আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি প্রমাণিত এবং পাঁচটি প্রমাণিত হয়নি। প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পর্কিত বিষয়। বিচারিক প্রক্রিয়ার এই ফলাফল আইনগত কাঠামোর ভেতরেই এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো উল্লেখ করছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দেন ইনু। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, পরদিন ১৯শে জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪–দলীয় জোটের সভা হয়। ওই বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর সিদ্ধান্ত হয়। তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ছবি দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতার একটি তালিকা প্রস্তুত করা এবং তাদের আটক ও নির্যাতনের নির্দেশ দিতে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করা হয়। আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং ছত্রীসেনা মোতায়েন করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোমাবর্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। চতুর্থ অভিযোগ- এতে বলা হয়, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং ছত্রীসেনা মোতায়েন করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোমাবর্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পঞ্চম অভিযোগে গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং সরকারের পক্ষ থেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ নির্যাতন–নিপীড়নের কার্যক্রমকে কৌশলে সমর্থন করার কথা উল্লেখ করা হয়। ষষ্ঠ অভিযোগ- ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের একটি সভায় উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সপ্তম অভিযোগে বলা হয়, একই বছরের ৪ আগস্ট শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে কারফিউ ও গুলি চালানোর সিদ্ধান্তে সম্মতি দেওয়া হয় এবং দলীয় নেতাদের তা বাস্তবায়নের নির্দেশ প্রদান করা হয়। অষ্টম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি সারা দেশে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র–জনতা আহত হওয়ার ঘটনায় নির্দেশনা বা সংশ্লিষ্ট ভূমিকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
যে তিনটি অভিযোগকে ভিত্তি করে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা, প্রমাণের গভীরতা এবং ঘটনাপ্রবাহের সাথে তাদের সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিল প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ কতটা সুনির্দিষ্টভাবে করা হয়েছে, তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ থাকা মৌলিক শর্ত। একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ের ঘটনাবলির বিচার করার ক্ষেত্রে প্রমাণের মানদণ্ড আরও কঠোর ও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি বলে অনেকেই মনে করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ইনু। এছাড়া তিনি ১৯৬০-এর দশকের একজন সুপরিচিত ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তার বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার গোলাপনগর। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে অনেকেই মনে করছেন, একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এমন দণ্ডাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারিক মানদণ্ড ও প্রমাণের গভীরতা আরও সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন ছিল।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মৌলিক ভিত্তি হলেও, একই সঙ্গে যেকোনো মামলায় নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আন্দোলনকালীন ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া কতটা নিখুঁতভাবে অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য, সভায় উপস্থিতি কিংবা যোগাযোগের মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা যায়, যা সরাসরি অপরাধমূলক নির্দেশ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট কি না—এ প্রশ্নও বিভিন্ন মহলে উঠেছে। এই ধরনের রায় ভবিষ্যতে বিচার ব্যবস্থার ওপর আরো বেশি করে জনআস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের বিশ্বাস দুর্বল হলে তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই রায়কে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ততা এবং ভবিষ্যৎ বিচারিক দিকনির্দেশনা নিয়েও নতুন করে আলোচনার সূচনা করেছে।
সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, মেলবোর্ন