মেলবোর্ন,১ জুলাই- বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন (বিএমসি) অর্থনৈতিক করিডোর ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কেউ এটিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে চীনকে ঘিরে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টিকে শুধু কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনার আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত এই করিডোর সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। এটি বহু বছর ধরে আলোচিত বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের একটি সংশোধিত ও বাস্তবসম্মত রূপ। নব্বইয়ের দশক থেকেই এ অঞ্চলের অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা এমন একটি করিডোরের কথা বলে আসছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক সংযোগকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এই করিডোরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। দ্রুত শিল্পায়ন, রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য এবং পরিবহন ব্যয় কমানোর জন্য নতুন স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ আরও সহজ হতে পারে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
তবে করিডোর নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অর্থায়নের বিষয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রকল্প পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এসব কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এগোতে হবে।
এছাড়া অনেকেই এই করিডোরকে রাখাইন সংকটের সময় আলোচিত মানবিক করিডোরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবে দুটি উদ্যোগের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানবিক করিডোরের লক্ষ্য ছিল সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, আর বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের উদ্দেশ্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ। তাই দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এসেছে। তাই চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদার করা মানেই অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমানভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরকে আবেগ, সন্দেহ বা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে বাস্তব অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও কৌশলগত দূরদর্শিতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা গেলে এই করিডোর বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।