একটি ইমেইলেই উন্মোচিত অস্ট্রেলিয়ার ২ বিলিয়ন ডলারের প্রতারণা শিল্প।
মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: অস্ট্রেলিয়ায় ই-মেইলভিত্তিক আর্থিক প্রতারণা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক ই-মেইল জালিয়াতি বা ‘বিজনেস ই-মেইল কম্প্রোমাইজ (বিইসি)’ প্রতারণা দেশটির সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করা সাইবার অপরাধে পরিণত হয়েছে। একটি মাত্র ভুয়া ই-মেইলের ফাঁদে পড়ে ড্রিম হোম কেনার জন্য জমা রাখা আড়াই লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার হারিয়েছেন হোপ ক্লিফোর্ড নামের এক নারী। এই ঘটনা নতুন করে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে অনলাইন প্রতারণা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
হোপ ক্লিফোর্ড তখন ৩২ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী টম ক্লিফোর্ডের সঙ্গে নিউ সাউথ ওয়েলসের ডাব্বো শহরে নিজেদের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় তাদের আইনজীবীর অফিসিয়াল ই-মেইল ঠিকানা থেকেই একটি বার্তা আসে, যেখানে সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। কিন্তু হোপ অবাক হয়ে দেখেন, তিনি সেই অর্থ তিন সপ্তাহ আগেই একই ই-মেইলের নির্দেশনা অনুযায়ী পাঠিয়ে দিয়েছেন।
পরে জানা যায়, তাদের আইনজীবীর ই-মেইল অ্যাকাউন্টে সাইবার অপরাধীরা প্রবেশ করে আসল ঠিকানা থেকেই ভুয়া ব্যাংক হিসাব পাঠিয়েছিল। ফলে কোনো সন্দেহ না করেই দম্পতি অর্থটি প্রতারকদের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন। পরে আইনজীবী জানান, ওই অর্থ চেয়ে পাঠানো প্রথম ই-মেইলটি তাদের অফিস থেকে পাঠানো হয়নি।
ঘটনার পরপরই ক্লিফোর্ড দম্পতি ব্যাংক ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে সপ্তাহান্তে তদন্ত শুরু হতে দেরি হওয়ায় অর্থ উদ্ধারের সুযোগও কমে যায়। দীর্ঘ দুই বছরের আইনি লড়াই এবং বিপুল আইনজীবী ব্যয়ের পর তারা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের মাধ্যমে হারানো অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশ ফেরত পান। তবে মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েন যে, পরে সেই জমি বিক্রি করে দেন। হোপ বলেন, এখনো সেই জায়গার পাশ দিয়ে যেতে পারেন না, কারণ পুরো ঘটনাটি তার কাছে এক দুঃস্বপ্নের স্মৃতি।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতারণা পর্যবেক্ষণ সংস্থা স্ক্যামওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কেবল ব্যবসায়িক ই-মেইল জালিয়াতিতেই অস্ট্রেলিয়ানরা ১৬ কোটি ৬৮ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার হারিয়েছেন। আর সব ধরনের প্রতারণা মিলিয়ে দেশটিতে এক বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১৮ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি।
ওয়েস্টপ্যাক ব্যাংকের জালিয়াতি প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান বেন ইয়ং বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্র এখন অত্যন্ত সংগঠিতভাবে কাজ করছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশে প্রতারণাকেন্দ্রিক বিশাল কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে, যেখানে উন্নত ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষকে লক্ষ্য করে প্রতারণা চালানো হচ্ছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতারণাকেন্দ্রে অনেক মানুষকে জোরপূর্বক আটকে রেখে কাজ করানো হয়। সেখানে নির্যাতন, সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিসের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মেকং অঞ্চলের প্রতারণা শিল্প থেকেই বছরে ৪৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ আয় হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি প্রতারণা চক্রের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার ভেতরেও তথাকথিত ‘স্ক্যাম মিউল’ ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী ও আর্থিক সংকটে থাকা মানুষ অনলাইনে কাজের প্রলোভনে পড়ে অজান্তেই প্রতারণার অর্থ বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করছেন, যা আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের অর্থপাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বেন ইয়ং আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম প্রতারকদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। আগে বানান বা ভাষাগত ভুল দেখে ভুয়া বার্তা চেনা যেত, কিন্তু এখন এআই ব্যবহার করে নিখুঁত ভাষায় প্রতারণামূলক বার্তা তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সার্চ হিস্ট্রি বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট ধরনের ভুয়া বিজ্ঞাপনও দেখানো হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার ইতোমধ্যে নতুন স্ক্যামস প্রিভেনশন ফ্রেমওয়ার্ক আইন কার্যকর করেছে। এর আওতায় ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে প্রতারণা প্রতিরোধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা, অ্যাকাউন্টের নাম যাচাই, ভুয়া বিজ্ঞাপন বন্ধ করা এবং স্পুফিং প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
সবশেষে হোপ ক্লিফোর্ড সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রতারণার শিকার হওয়া লজ্জার বিষয় নয়। বরং এসব ঘটনা প্রকাশ্যে এলে অন্যরা সচেতন হতে পারবেন এবং একই ধরনের প্রতারণা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন।