রাবি শিক্ষক প্রভাস কুমার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৭ আগষ্ট- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রভাস কুমার কর্মকারকে যৌন হয়রানি ও একাডেমিক অনিয়মের অভিযোগে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম।
তবে প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত ঘিরে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং তদন্ত কমিটির কার্যক্রম কতটা নিরপেক্ষ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, নিয়ম মেনেই একাধিক তদন্তের পর সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের আগস্টে নিজ বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে চেম্বারে ডেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানি এবং অশালীন প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে। ওই শিক্ষার্থীর মা ১৩ আগস্ট বিভাগীয় সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি আরও তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন সেলের মাধ্যমে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত চলাকালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর প্রভাস কুমারকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ জানান, অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে নারী হয়রানির পাশাপাশি প্রশ্নফাঁসের অভিযোগও ছিল। এসব অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে অভিযুক্ত শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট সভায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলামও জানিয়েছেন, অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে দুটি কমিটি কাজ করেছে। কমিটিগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সিন্ডিকেট তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক প্রভাস কুমারের নিজস্ব বক্তব্য বা তিনি তদন্ত কমিটির কাছে কী ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন, তা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। ফলে অভিযোগের বিপরীতে অভিযুক্ত শিক্ষকের অবস্থান এবং তদন্ত প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সরাসরি শাস্তি দেওয়া হয় না। অভিযোগ যাচাইয়ে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গত পাঁচ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
২০২২ সালে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগে মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সালমা খাতুনকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের উপপ্রধান চিকিৎসক ডা. রাজু আহমেদকেও চাকরিচ্যুত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তা যেই হোন না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি বা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।