ফিজিজুড়ে এইচআইভি সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সংকট মোকাবিলা করছে দেশটি। (এবিসি নিউজ: সাইরুসি তাবুয়ালুমা, ফাইল ছবি)
ফিজিতে এইচআইভি সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির প্রতি ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন।
সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে ফিজিতে ২ হাজার ১৬ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় নতুন শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে ২৭ শতাংশ।
এ ছাড়া গত বছর এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে ৫৯টি শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে ১৮ জনই প্রথম জন্মদিনের আগেই মারা যায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরীক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর ফলে আরও বেশি সংক্রমণ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তুলনামূলকভাবে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা যাচ্ছে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এখন বিনা মূল্যে, স্বেচ্ছামূলক ও গোপনীয়ভাবে এইচআইভি পরীক্ষা করার সুযোগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে ফিজি সরকার। পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ওষুধ, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের জন্য ক্ষতি কমানোর (হার্ম রিডাকশন) সেবা এবং চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে।
পাঁচ বছর আগে ফিজিতে প্রতি ১৬৭ জনে একজন এইচআইভিতে আক্রান্ত ছিলেন। বর্তমানে সেই হার বেড়ে প্রতি ৬০ জনে একজন হয়েছে।

ফিজিজুড়ে দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে এইচআইভি পরীক্ষা কার্যক্রম। (এবিসি নিউজ: জেরেমি স্টোরি কার্টার, ফাইল ছবি)
সুচের সংকট নিয়ে উদ্বেগ
ফিজির ন্যাশনাল এইচআইভি আউটব্রেক রেসপন্সের চেয়ারম্যান জেসন মিচেল এবিসির ‘দ্য ওয়ার্ল্ড’কে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের কারণে দেশটিতে একসময় সিরিঞ্জ ও সুচের সংকট তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, এসব অভিযান প্রয়োজনীয় হলেও এর ফলে ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
জেসন মিচেল বলেন, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের জন্য সহজলভ্যভাবে জীবাণুমুক্ত সুচ ও সিরিঞ্জ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে তারা একই সুচ ভাগাভাগি করে ব্যবহারের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবেন।
সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ এবং দ্রুত তা সম্প্রসারণে সরকারের সাহস ও নেতৃত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
তার ধারণা, ফিজিতে এইচআইভি মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও তাদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে দেশের সবাই একসঙ্গে কাজ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে, যদিও এর জন্য সময় লাগবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্বের দ্রুততম সংক্রমণ বৃদ্ধির একটি ফিজিতে
প্রায় ৯ লাখ জনসংখ্যার দেশ ফিজিতে নতুন এইচআইভি সংক্রমণের হার বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের এইডসবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডস।
সংস্থাটির হিসাবে, গত বছর ফিজিতে প্রায় ৯ হাজার ১০০ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছিলেন। তাদের মাত্র ৩৯ শতাংশ নিজেদের এইচআইভি আক্রান্তের বিষয়টি জানতেন। আর অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাত্র ২২ শতাংশ।
ইউএনএইডসের নির্বাহী পরিচালক উইনি বিয়ানিমা বলেন, পরিস্থিতির জরুরি প্রয়োজনীয়তা ফিজি সরকার বুঝতে পেরেছে এবং তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপ জোরদার করছে।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে ফিজির পরিস্থিতি বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে এইডসের অবসান এখনো হয়নি।
ইউএনএইডস জানিয়েছে, যেসব আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংক্রমণের কারণ জানা গেছে, তাদের অর্ধেকের বেশি যৌন সংক্রমণের মাধ্যমে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। আর ৪২ শতাংশের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের ফলে।
সুচ-সিরিঞ্জ কর্মসূচি ও PrEP
সরকারের সুচ ও সিরিঞ্জ কর্মসূচি চালু এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে ব্যবহৃত প্রি-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস বা PrEP-এর সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে ইউএনএইডস।
সংক্রমণ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, তা দূর করতে পাঁচজন মন্ত্রীকে নিয়ে একটি মন্ত্রিসভা উপকমিটিও গঠন করেছে ফিজি সরকার।
সরকার জানিয়েছে, এইচআইভি নিয়ে বসবাসকারী মানুষের সঙ্গে বৈষম্য করা দেশটিতে বেআইনি। আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য দেশজুড়েই প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ফিজিতে প্রতি ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার হার আফ্রিকার কিছু অঞ্চলের তুলনায় কম। আফ্রিকার কিছু এলাকায় প্রতি ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের প্রায় একজন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন।
সূত্র- এবিসি নিউজ