অর্থনীতিতে একাধিক চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করলেন অর্থমন্ত্রী। ছবিঃ সংগৃহীত
দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে জিডিপির তুলনায় কর আদায় কম, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) জাতীয় আন্তবিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিযোগিতা ‘ইকোনথন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে কর আদায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এখন বেশ অনিশ্চিত। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে এসেছে। গত দশকের তুলনায় অর্থায়নের ব্যয় বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ ও শুল্ক বাধা বাড়ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়েও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিবছর দেশের অর্থনীতিতে নতুন ক্ষতির বোঝা যোগ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতি হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অর্থনৈতিক ধাক্কা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও প্রভাব ফেলে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে পণ্যের দাম, টাকার বিনিময় হার এবং দেশের কারখানাগুলোর রপ্তানি আদেশে প্রভাব পড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাজের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিদিনই সেখানে নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। বাজেট তৈরির সময় একটি নির্দিষ্ট অনুমানের ওপর পরিকল্পনা করা হলেও পরবর্তী সময়ে জ্বালানির দামের পরিবর্তন, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বন্যা কিংবা বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মতো নতুন পরিস্থিতি সামনে আসে।
তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির দিকে তাকালে এখন অনিশ্চয়তাই স্বাভাবিক অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণেও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্থিতি ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে করব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য, সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির বিষয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, উত্তরণের সময়সূচি যাই হোক না কেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের অর্থনীতিকে প্রস্তুত করতে হবে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে শুধু বাণিজ্য সুবিধা বা বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে পণ্য ও সেবার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতির নানা সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন আমির খসরু। তিনি বলেন, অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য ও সীমিত সময়ের মধ্যেই জনগণের কাছে জবাবদিহি রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ফলে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কোনো সমস্যা লুকিয়ে রাখলে তার সমাধান হয় না। বরং সমস্যা স্বীকার করার মধ্য দিয়েই সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অর্থনীতির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আমির খসরু বলেন, চাপের মধ্যে চিন্তা করতে পারা, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারা নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু অর্থনীতির তাত্ত্বিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করা এবং যুক্তিনির্ভরভাবে সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতাও প্রয়োজন।
‘ইকোনথন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ এবং নীতিনির্ধারণে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।