ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের ফ্লিন্ডার্সে অবস্থিত সম্পত্তিটি। ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজারে মন্দার প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এর ধাক্কা এবার পড়েছে দেশটির বিলাসবহুল আবাসন খাতেও। ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের মর্নিংটন পেনিনসুলার ফ্লিন্ডার্স এলাকায় একটি বিলাসবহুল বাড়ি বিক্রি হয়েছে ৭৮ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারে। অথচ মাত্র এক বছর আগে একই ক্রেতা বাড়িটির জন্য ১ কোটি ২৫ হাজার ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাড়িটির বিক্রয়মূল্য কমেছে ২৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
চার শয়নকক্ষের বাড়িটি বিক্রির জন্য বাজারে ছিল ৩০৫ দিন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত আগের সেই ক্রেতার কাছেই কম দামে বাড়িটি বিক্রি করতে রাজি হন মালিকেরা। অস্ট্রেলিয়ার বিলাসবহুল আবাসন বাজারে চলমান মন্দার এটি সর্বশেষ উদাহরণ।
বাড়িটির বিক্রিতে সহায়তা করা সথেবিজের আবাসন এজেন্ট রব কার্টিন আশা করছেন, উচ্চ সুদের হারের চাপে বাজারের দরপতন হয়তো তলানিতে পৌঁছেছে। তবে ক্রেতাদের আগ্রহ এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
অস্ট্রেলিয়ান ফিন্যান্সিয়াল রিভিউকে কার্টিন বলেন, এক মাস আগেও তাঁর ধারণা ছিল বাজারের দরপতন থেমেছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি না হলেও ক্রেতাদের অনুসন্ধান ও আগ্রহ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
তিনি আশা করছেন, নভেম্বরের মধ্যে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ৭ ডলারে পৌঁছানো কিংবা ব্যাংকিং খাতে কোনো সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
কার্টিন জানান, বছরের এই সময়ে বাজারে বিক্রির জন্য বাড়ির সরবরাহও তুলনামূলক কম। যেসব মালিক এ বছর অথবা আগামী বছর বাড়ি বিক্রির কথা ভাবছেন, তাঁদের নির্বাচনের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
সিডনির ঐতিহাসিক প্রাসাদেও বড় দরপতন
অস্ট্রেলিয়ার বিলাসবহুল আবাসন বাজারের দুরবস্থার আরেকটি উদাহরণ সিডনির বালমেইন ইস্ট এলাকার ঐতিহাসিক প্রাসাদ ‘রোথেসে’। ডার্লিং হারবার ও বারাঙ্গারুর মনোরম দৃশ্য দেখা যায় ছয় শয়নকক্ষের এই বাড়ি থেকে। সম্প্রতি এটি বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারে।
অথচ ২০২২ সালে একই সম্পত্তি বিক্রি হয়েছিল ১ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার ডলারে। সে হিসাবে চার বছরের ব্যবধানে বাড়িটির দাম কমেছে প্রায় ৬৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা প্রায় ৩৫ শতাংশ।
১৮৬৮ সালে নির্মিত গথিক রিভাইভাল স্থাপত্যশৈলীর এই প্রাসাদটি একাধিকবার বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়। প্রথমদিকে এর বিক্রয়মূল্য ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সিডনির ইনার ওয়েস্ট এলাকার এক স্থানীয় ক্রেতা বাড়িটি কিনেছেন। ক্রেতার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
২০২২ সালে ব্যবসায়ী দেবেশ মিশ্র ও তাঁর স্ত্রী অংশিকা সম্পত্তিটি কিনেছিলেন। সে সময় তাঁরা বন্ধকঋণ-সংক্রান্ত ব্যবসায় যুক্ত হাইথাম রিফাই ও ম্যালকম ডের কাছ থেকে বাড়িটি কেনেন।
দেবেশ মিশ্র অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কর্নেল ও এমটিকিউ গ্রুপের পরিচালক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ধসে পড়ে এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের দায়ের কথা উঠে আসে। পরে মিশ্র দেউলিয়া ঘোষণা করেন এবং প্রাসাদটি বিক্রির জন্য রিসিভার নিয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ঋণদাতার দখলে থাকা সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়ায় বাড়িটি হাতবদল হয়।
বিক্রয় এজেন্ট ম্যাথিউ হেইসনের মতে, বাড়িটির দাম কমার পেছনে আবাসন বাজারের মন্দার পাশাপাশি ২০২২ সালে অস্বাভাবিক বেশি দামে সম্পত্তিটি কেনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
ফিন্যান্সিয়াল রিভিউকে তিনি বলেন, ২০২২ সালে কেনার সময় বাড়িটি ছিল একেবারে নতুন। তবে তখনও এর দামকে অনেক বেশি বলে মনে করা হয়েছিল। উপদ্বীপ এলাকায় এটিই ছিল এ পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া সর্বোচ্চ দামের বিক্রি, যদিও সম্পত্তিটি সরাসরি জলরেখার পাশে অবস্থিত ছিল না।
আবাসন বাজারে ১৫ শতাংশ দরপতনের আশঙ্কা
অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজার নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করে গত মে মাসে। সে সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলি পূর্বাভাস দিয়েছিল, দেশজুড়ে বাড়ির দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
এরপর পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া (আরবিএ) সুদের হার বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে।

১৮৬৮ সালে নির্মিত গথিক রিভাইভাল স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহাসিক প্রাসাদ ‘রোথেসে’ ২০২২ সালে সিডনির বালমেইন ইস্ট এলাকায় সর্বশেষ ১ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কোটালিটির গবেষণা পরিচালক টিম ললেস এবং এএমপির প্রধান অর্থনীতিবিদ শেন অলিভার দুজনই পূর্বাভাস দিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ির দাম সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামার ক্ষেত্রে মোট পতন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তাঁদের এই পূর্বাভাস এইচএসবিসির ১৩ শতাংশ দরপতনের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ির নামমাত্র দামের হিসাবে এটিই হবে সবচেয়ে বড় পতন।
ললেস সংবাদমাধ্যম নিউজ ডটকম ডটএইউকে বলেন, সাম্প্রতিক প্রান্তিকের মূল্যবৃদ্ধি ও পতনের প্রবণতাকে বার্ষিক হিসাবে রূপান্তর করলে দেখা যায়, দেশজুড়ে বাড়ির দাম কমার হার দাঁড়ায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। আর রাজধানী শহরগুলোতে এই হার ১৭ দশমিক ১ শতাংশ।
তাঁর ভাষ্য, বাড়ির দাম ইতিমধ্যে এই হারে কমতে দেখা যাচ্ছে। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ললেসের মতে, সুদের হার বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কোনো সুস্পষ্ট সমাধান না আসায় আবাসন বাজারের দরপতন আবারও তীব্র হতে পারে।
সিডনি ও মেলবোর্নে সবচেয়ে বেশি চাপ
কোটালিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ির সামগ্রিক মূল্যসূচক ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
দেশটির প্রধান রাজধানী শহরগুলোর সম্মিলিত হিসাবে এই পতনের হার ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে সিডনিতে, ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে মেলবোর্ন, যেখানে বাড়ির দাম কমেছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যান বলছে, অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজারের সংকট আর শুধু সাধারণ আবাসিক সম্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ঐতিহাসিক প্রাসাদ থেকে শুরু করে বহু মিলিয়ন ডলারের বিলাসবহুল বাড়িও মূল্যহ্রাসের মুখে পড়ছে। উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: নিউজ.কম.এইউ