বিজয়া দশমীতে সিঁদুরের রঙে আনন্দ, দেবী বিদায়ে বিষাদ
ওটিএন বাংলা ডেস্ক : ছয় দিনের পূজা-অর্চনা শেষে বিদায়ের পালা দেবী দুর্গার। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন, দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জনের মধ্য…
শতদল তালুকদার, সিডনি-
শরতের স্নিগ্ধ আবহ, দেবীবন্দনার পবিত্র অনুরণন আর বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের আবাহনে সিডনিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। দর্পণ কালচারাল অ্যান্ড রিলিজিয়াস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর সিডনির সেন্ট মেরি’স মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এই উৎসব পরিণত হয় প্রবাসী বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ এবং বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতিতে উৎসবের প্রতিটি পর্বে প্রতিফলিত হয়েছে ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ, ভক্তির নিবেদন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য আবহ।
দেবীবন্দনায় উৎসবের শুভারম্ভ
শুক্রবার দেবীর অকালবোধন ও বোধনপূজার মধ্য দিয়ে সূচনা হয় শারদীয় আয়োজনের। প্রতিমার নান্দনিক সাজসজ্জা, পূজার আনুষ্ঠানিকতা এবং ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানস্থল হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। সুদূর বাংলাদেশ থেকে বহন করে আনা শিকড়ের টান, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেন একসূত্রে গেঁথে দেয় প্রবাসী বাঙালির হৃদয়কে।
পূজা, প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় প্রাণের উচ্ছ্বাস
শনিবার সকালে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে পূজার্চনার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব সম্পন্ন হয়। দেবীর চরণে ভক্তদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং প্রার্থনার আবহে মুখরিত হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ।
দুপুরের পর শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন ও খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। তাদের হাসি-আনন্দ, প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ এবং ঢাকের তালে নৃত্যের উচ্ছ্বাস উৎসবে যোগ করে ভিন্নমাত্রা। নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি তাদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশেরও সুযোগ সৃষ্টি করে এই আয়োজন।
পরবর্তী সাংস্কৃতিক পর্বে দর্পণের নবীন সদস্যরা সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশনের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে। প্রবাসের মাটিতে বাংলা ভাষা, শিল্প-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় তাঁদের পরিবেশনায় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দর্পণের নবীন সদস্যরা সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশনের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি ও সহযোগীদের সম্মাননা
উৎসবকে বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে সম্পৃক্ত করার প্রয়াসে দর্পণ আমন্ত্রণ জানায় বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সম্মানিত অতিথিদের। তাঁদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পেনরিথ সিটি কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র হলি ম্যাকলিন (Hollie McLean) এবং অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রতিনিধি কারেন কোরি (Karen Correy), সঙ্গে আরও কয়েকজন বিশিষ্ট অতিথি।
অনুষ্ঠানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পর্ব ছিল আয়োজনে সহযোগিতাকারী স্পনসরদের সম্মাননা প্রদান। তাঁদের অবদান ও উদার সহযোগিতার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। একটি সফল আয়োজনের নেপথ্যে সহযোগীদের সম্মিলিত ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে দর্পণ পরিবার তাঁদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
আরতি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ভক্তির আবেশ
শনিবার সন্ধ্যার আরতি ও ঢাকের ছন্দে পূজামণ্ডপ ভরে ওঠে এক অনির্বচনীয় ভক্তিময় আবহে। প্রদীপের আলো, আরতির আনুষ্ঠানিকতা এবং ঢাকের গম্ভীর অনুরণন যেন দেবীবন্দনার আবেগকে আরও গভীর করে তোলে।

পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনিময় উৎসবের আবহকে করে তোলে আরও আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ। চবিঃ ওটিএন বাংলা
এরপর শুরু হয় বড়দের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় দর্শকেরা উপভোগ করেন বাঙালির শিল্প-ঐতিহ্যের বিচিত্র রূপ। ভক্তি, নান্দনিকতা ও সাংস্কৃতিক চেতনার সম্মিলনে সন্ধ্যার আয়োজন হয়ে ওঠে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
তিন দিনব্যাপী আয়োজনজুড়ে দুপুর, সন্ধ্যা ও রাতে প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থাও ছিল। ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ গ্রহণ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনিময় উৎসবের আবহকে করে তোলে আরও আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ।
দশমীর আবেগঘন বিদায়, আগামী বছরের প্রতীক্ষা
রবিবার বিজয়া দশমীর আয়োজনে উৎসব পায় তার আবেগঘন পরিণতি। অঞ্জলি নিবেদন, সিঁদুর খেলা এবং প্রবাসী বাঙালির মিলনমেলায় দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দ ও বিষাদের এক অপূর্ব সম্মিলন। দেবী দুর্গার বিদায়লগ্নে ভক্তদের মনে যেমন ছিল বিচ্ছেদের বেদনা, তেমনি ছিল আগামী শরতে পুনরায় মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা।
তিন দিনের এই মহোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে চিরচেনা প্রত্যয়ে—“আসছে বছর আবার হবে।”
প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও ধর্মীয় বিশ্বাস, বাঙালির ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সযত্নে লালন করার যে প্রয়াস দর্পণ কালচারাল অ্যান্ড রিলিজিয়াস অ্যাসোসিয়েশন গ্রহণ করেছে, এই আয়োজন তারই একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিফলন। এমন উৎসব কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্যের প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখা, পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং বহুসাংস্কৃতিক অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালির স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়কে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au