বিশ্ব

উৎসবের মঞ্চে ঐতিহ্য ও মানবিকতার মেলবন্ধন, ‘মহাশক্তি সম্মান’-এ স্বীকৃতি ২৫ দুর্গাপুজোর

  • 6:20 am - October 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫০ বার
উৎসবের মঞ্চে ঐতিহ্য ও মানবিকতার মেলবন্ধন, ‘মহাশক্তি সম্মান’-এ স্বীকৃতি ২৫ দুর্গাপুজোর। ছবিঃ সরবরাহকৃত

দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক অবদান ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে স্বীকৃতি দিতে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ২৫টি দুর্গাপুজো কমিটিকে ‘মহাশক্তি সম্মান’ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ‘উই আর দ্য কমন পিপল’ এবং ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিউনিটি এলায়েন্স’। এই সম্মাননার মাধ্যমে মণ্ডপের নান্দনিকতা ও উৎসবের জাঁকজমকের পাশাপাশি ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে আয়োজকেরা।

এই উদ্যোগে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির দুর্গাপুজো। যৌনকর্মীদের সংগঠনটির উদ্যোগে আয়োজিত এই পুজোকে উৎসবের সর্বজনীন চরিত্র, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলার বনেদি বাড়ির পুজো এবং কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সর্বজনীন দুর্গোৎসবগুলোকেও একই সম্মাননার পরিসরে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘মহাশক্তি সম্মান’-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছন্দা দত্তগুপ্তের স্মৃতি। তাঁর নামে বিশেষ পুরস্কারটির নাম রাখা হয়েছে ‘Chhanda Duttagupta Award for Excellence in Festive Heritage & Social Commitment’। উৎসবের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি দেওয়াই এই পুরস্কারের মূল ভাবনা।

ঐতিহ্যবাহী পুজো কমিটিগুলোর স্বীকৃতি

কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিসরে উত্তর কলকাতার বহু ঐতিহ্যবাহী পুজো কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ‘মহাশক্তি সম্মান’-এর প্রসঙ্গে উঠে এসেছে টালা প্রত্যয়, বাগবাজার সর্বজনীন, জগৎ মুখার্জি পার্ক, কুমোরটুলি সর্বজনীন, কুমোরটুলি পার্ক সর্বজনীন, আহিরীটোলা সর্বজনীন, চোরবাগান সর্বজনীন, হাতিবাগান সর্বজনীন, নলিনী সরকার স্ট্রিট সর্বজনীন এবং কাশী বোস লেন সর্বজনীন দুর্গোৎসবের নাম।

এ ছাড়া শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব, কলেজ স্কোয়ার সর্বজনীন দুর্গোৎসব, আশা ও অভিলাসা দুর্গোৎসব কমিটি এবং বেলেঘাটার ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাবের মতো পুজো কমিটিও এই সম্মাননার সঙ্গে যুক্ত বলে আয়োজকদের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

কলকাতার দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, শিল্পকলা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই উৎসব শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী পুজোগুলোর সঙ্গে এলাকার ইতিহাস, মানুষের স্মৃতি ও সামাজিক সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে। এই সম্মাননার মাধ্যমে সেই ঐতিহ্য এবং তার সঙ্গে যুক্ত মানুষের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বনেদি বাড়ির পুজোও থাকছে সম্মাননার পরিসরে

সর্বজনীন দুর্গোৎসবের পাশাপাশি পারিবারিক দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দিয়েছে এই উদ্যোগ। উত্তর কলকাতার ঘোষবাড়ির পুজোর প্রসঙ্গে তমগ্ন ঘোষের নাম এবং দক্ষিণ কলকাতার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পুজোর ক্ষেত্রে লোকনাথ চট্টোপাধ্যায়ের নাম সম্মান গ্রহণের প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোগুলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পারিবারিক রীতি, আচার এবং ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে, সর্বজনীন পুজো বৃহত্তর জনসমাজকে একত্রিত করে এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে। এই দুই ধারাকে একই সম্মাননার আওতায় আনার মধ্য দিয়ে বাংলার দুর্গোৎসবের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিশেষ গুরুত্ব দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির পুজোয়

‘মহাশক্তি সম্মান’-এর আলোচনায় দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির দুর্গাপুজোর অন্তর্ভুক্তি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। যৌনকর্মীদের সংগঠনটির উদ্যোগে আয়োজিত এই পুজো ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সমাজে অন্তর্ভুক্তি, মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।

দুর্গাপুজোকে বাংলার সর্বজনীন উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সেই সর্বজনীনতার বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করতে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের অংশগ্রহণ ও স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির পুজোকে সম্মাননার পরিসরে আনা উৎসবের সামাজিক মাত্রাকে সামনে নিয়ে আসে।

উৎসবের আয়োজনের ক্ষেত্রে কারা অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের উদ্যোগ কীভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ সাংস্কৃতিক পরিসরে কতটা জায়গা পাচ্ছেন, সেই প্রশ্নগুলোও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী পুজোর পাশাপাশি সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় ‘মহাশক্তি সম্মান’ আলাদা মাত্রা পেয়েছে।

ছন্দা দত্তগুপ্তের স্মৃতিতে বিশেষ পুরস্কার

প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছন্দা দত্তগুপ্তের স্মৃতিকে ধারণ করে বিশেষ পুরস্কারটির নামকরণ করা হয়েছে ‘Chhanda Duttagupta Award for Excellence in Festive Heritage & Social Commitment’।

পুরস্কারটির নামের মধ্যেই উৎসবের ঐতিহ্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় দুটি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে পুজোর সাফল্যকে শুধু মণ্ডপের আকার, আলোকসজ্জা কিংবা দর্শনার্থীর উপস্থিতির ভিত্তিতে বিচার না করে, উৎসবের সাংস্কৃতিক ভূমিকা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বকেও বিবেচনায় নেওয়ার ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

দুর্গাপুজোর আয়োজনের সঙ্গে প্রতিমাশিল্পী, মণ্ডপশিল্পী, আলোকসজ্জার কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, পুজো কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত শ্রম জড়িয়ে থাকে। তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে একটি পুজো শুধু নির্দিষ্ট এলাকার অনুষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ হয়ে ওঠে। এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবের পেছনে থাকা মানুষদের ভূমিকাও সামনে আনার চেষ্টা রয়েছে।

উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আয়োজকেরা

‘মহাশক্তি সম্মান’ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ‘উই আর দ্য কমন পিপল’-এর সম্পাদক এবং ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিউনিটি এলায়েন্স’-এর আহ্বায়ক শুভজিৎ দত্তগুপ্ত। দীপঙ্কর দে-ও এই উদ্যোগের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। আয়োজকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে প্রিয়াংশু দে, রাহুল দাস এবং আকাশ গাঙ্গুলির নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মোট ২৫টি দুর্গাপুজো কমিটিকে এই সম্মাননার আওতায় আনা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ পুরস্কারপ্রাপকদের তালিকা, অনুষ্ঠানস্থল, আয়োজনের নির্দিষ্ট তারিখ এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

ঐতিহ্যের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা

কলকাতার দুর্গাপুজো প্রতিবছর শিল্প, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক মিলনের এক বিস্তৃত পরিসর তৈরি করে। এই উৎসবের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, শিল্পীদের জীবিকা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং এলাকার মানুষের আবেগও জড়িয়ে থাকে।

‘মহাশক্তি সম্মান’-এর উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী সর্বজনীন পুজো, বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব এবং দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির মতো সামাজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগকে একই পরিসরে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের অংশগ্রহণ ও স্বীকৃতির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

উৎসবের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে পাশাপাশি রেখে ‘মহাশক্তি সম্মান’ দুর্গোৎসবের বৃহত্তর মানবিক দিকটিকে তুলে ধরতে চাইছে। আয়োজকদের উদ্যোগের মূল বার্তা হলো, উৎসবের আলো শুধু মণ্ডপের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ, মর্যাদা ও স্বীকৃতির পথও আলোকিত করুক।

এই শাখার আরও খবর

পারিবারিক বন্ধুর হামলায় পা হারালেন অস্ট্রেলিয়ার নারী এমপি, সর্বশেষ যা জানা যাচ্ছে

অস্ট্রেলিয়ায় স্বতন্ত্র নারী সংসদ সদস্য হেলেন হেইন্সকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে হামলাকারীর পরিচয় ঘিরে। ৬৫ বছর বয়সী এই এমপির ওপর…

ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা

ইরানে আবারও হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তিনি ইরানের সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ…

যুদ্ধ এড়াতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিল পাকিস্তান ও কাতার

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুই দেশের কাছে…

বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন: বিদায়ের বেদনা, ঐতিহ্য, ধর্মীয় তাৎপর্য ও সম্প্রীতির মহামিলন

শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুলের দোলা, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস, ঢাকের মধুর বাদ্য আর চারদিকে উৎসবের আমেজ—এসবের মধ্য দিয়েই বাঙালির হৃদয়ে আবির্ভূত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব।…

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম

‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম।’ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়ে সুইটি আক্তারের…

ধামরাইয়ের ৫২০ কেজির অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা, হবে না বিসর্জন

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: ঢাকার ধামরাইয়ের বণিকবাড়িতে ৫২০ কেজি ওজনের অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমার পূজা চলছে। আগামীকাল বুধবার পূজা শেষে এটি দেওয়া হবে না বিসর্জন। এটিই এখানকার রীতি।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au