সৌদি আরবে নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কূটনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ
মক্কায় মসজিদের ভেতরে চুম্বনের অভিযোগে এক বাংলাদেশি পুরুষ ও এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। তবে তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কিংবা তা কার্যকরের বিষয়ে সৌদি…
বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ও বিদ্যুৎ ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প।
সকাল ১১টা। ঢাকার উত্তরে আশুলিয়ায় হা-মীম গ্রুপের পোশাক কারখানার প্রতিটি তলায় চলছে কর্মব্যস্ততা। যন্ত্রের সাহায্যে ডেনিম কাপড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন অংশ। পাশেই শ্রমিকেরা সেলাই করে তৈরি করছেন জিনস, স্কার্ট ও জ্যাকেট।
এরপর কাপড় ধোয়া, ইস্ত্রি, বোতাম ও চেইন লাগানোর কাজ। সবশেষে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লেবেল। এসব পোশাকের বড় ক্রেতা গ্যাপ, আমেরিকান ঈগল ও জেসি পেনি। হা-মীম গ্রুপের প্রায় ৯০ হাজার কর্মী মিলে প্রতি মাসে তৈরি করেন ৯৩ লাখ পোশাক।
কিন্তু হঠাৎ কারখানার আলো কয়েকবার জ্বলে-নিভে ওঠে। মুহূর্তের জন্য অন্ধকার নেমে এলেও আবার আলো জ্বলে ওঠে। একই সঙ্গে বিকট শব্দে চালু হয় যুক্তরাজ্যে তৈরি চারটি ডিজেল জেনারেটর। গ্যাস সরবরাহ কমে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় এসব জেনারেটর।
হা-মীম গ্রুপের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী বলেন, ‘বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ ভালো নয়, প্রায়ই বিঘ্ন ঘটে। গ্যাসের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হলো ডিজেল। গ্রিডের বিদ্যুতের অবস্থান তৃতীয়। প্রায় পুরো অর্থনীতিই ডিজেলের ওপর চলে।’
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫১০ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশে জ্বালানিনির্ভরতার এমন চিত্র উদ্বেগজনক। ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর তাৎক্ষণিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস এই খাত সরাসরি প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও অসংখ্য মানুষের জীবিকা। গত বছর পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি। হা-মীম গ্রুপ একাই রপ্তানি করেছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক।
বাংলাদেশের সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটে পড়েছে। এর সবচেয়ে বেশি চাপ বহন করতে হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা তেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরতার কারণে ফিলিপাইন জরুরি জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সপ্তাহে চার দিন কর্মদিবস চালু, সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণে বিধিনিষেধ এবং ফ্লাইট বাতিলের মতো পদক্ষেপ।
নাইজেরিয়ায় ডিজেলের দাম বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। তানজানিয়া ও ইথিওপিয়ায় বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। এতে কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত চাল ও ভুট্টার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামেও পড়ছে এর প্রভাব।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দারমিত গিল এপ্রিলে সতর্ক করে বলেন, ‘সবচেয়ে দরিদ্র মানুষ, যাঁদের আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ খাবার ও জ্বালানিতে ব্যয় হয়, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
প্রায় চার কোটি মানুষের নগরী ঢাকায় সাধারণত রাতেও কর্মচাঞ্চল্য থাকে। কিন্তু জ্বালানি সংকটে শহরটির রাত এখন অনেকটাই অন্ধকার। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় সরকার ব্যাপক বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও সরবরাহ কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। হাসপাতাল ও ফার্মেসির মতো জরুরি সেবাকে এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার আলোকিত বিলবোর্ডগুলো সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পরই নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দোকানপাটও বন্ধ হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও সংকটের প্রভাব পড়েছে। রান্নার জন্য গ্যাসের চাপ পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত হতে অনেককে ভোরে উঠে পড়তে হচ্ছে। প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে কতক্ষণ বৈদ্যুতিক পাখা চালানো যাবে, কিংবা গ্যাস স্টেশনে কত দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতে হবে, এসবও এখন নিত্যদিনের হিসাব।
ব্যবসা-বাণিজ্যে সংকট বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, বাংলাদেশে শিগগিরই ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন।
বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতাও বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়নে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি। ফলে বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানির প্রায় অর্ধেক মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করতে হয়।
গত জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়। এর পেছনে ছিল হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অবরোধ ও সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি পুনর্গ্যাসীকরণ টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ড। ওই অগ্নিকাণ্ডে টার্মিনালটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গত মাসে বিরোধী দলের হাজারো সমর্থক দীর্ঘ পদযাত্রা করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের ওপর জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা। গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া প্রধানমন্ত্রীর জন্য ইরান যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘নতুন সরকারের জন্য জ্বালানি এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এটি বিরোধীদের আন্দোলন জোরদার করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।’
বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সম্পর্ক থাকলেও দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
২০২৪ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। এতে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ তার মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ ভারত থেকে আমদানি করে। বিদ্যুতের এই নির্ভরশীলতা কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে ভারতের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে জাতীয় জ্বালানিনীতি প্রণয়নে যুক্ত থাকা বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধও বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান রোসাটম নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগ করেছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর বড় অংশ এসেছে রাশিয়ার সহায়তাপুষ্ট ঋণ থেকে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরুর কথা ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে অর্থ পরিশোধে জটিলতা এবং আকাশ ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় প্রকল্পটির কাজ বারবার পিছিয়েছে।
অবশেষে ১১ অক্টোবর কেন্দ্রটিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন ডিসেম্বরে কেন্দ্রটি চালুর প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতায় পৌঁছানোর আগে কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে পরীক্ষা চালাতে হবে।
এদিকে ১৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্যানকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’। এতে রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সহায়তাকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে। ফলে রূপপুর কেন্দ্রের ঋণ পরিশোধ ও পারমাণবিক জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমোদন বা অনুমোদিত অর্থ পরিশোধব্যবস্থার সহায়তা নিতে হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ। গত ২৫ সেপ্টেম্বর দুই দেশ বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এতে ছোট আকারের মডুলার পারমাণবিক চুল্লি বা স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সই হয়। ওই চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল গত জুনে মালয়েশিয়া ও চীনে। বেইজিং সফরে দুই দেশ ১৭টি চুক্তি ও অন্যান্য সহযোগিতার দলিলে সই করে। দুই দেশের সম্পর্ককে ‘নতুন যুগে’ প্রবেশের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এসব চুক্তির একটিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টি রয়েছে।
তবে চুক্তিগুলোর দুটিতে এমন কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠী যুক্ত ছিল, যাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ নিয়ে অগ্রসর পর্যায়ের আলোচনা চলছে।
বিভিন্ন দেশের ওপর জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে সরকার। সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থাসহ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। তবে পাঁচ বছরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এই গতিতে ছয় গুণের মতো বৃদ্ধি আনতে হবে।
গত সপ্তাহে ২০২৬ সালের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের এক আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘আমরা জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার এবং নতুন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রত্যেক নাগরিককে জ্বালানির ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার বিষয়েও কাজ করছি।’
তবে বাসাবাড়ির জন্য ছাদের সৌরবিদ্যুৎ কার্যকর হলেও বিপুল জ্বালানিনির্ভর শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
হা-মীম গ্রুপের কারখানার ছাদে ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এটি দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বড় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা। কিন্তু তনুল চক্রবর্তীর ভাষ্য, কারখানা চত্বরে সৌরবিদ্যুৎ থেকে দিনে সম্ভবত চার ঘণ্টার মতো কার্যকর সুবিধা পাওয়া যায়, যখন সূর্যের আলো সবচেয়ে বেশি থাকে। অথচ কারখানাটি চলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা।
জ্বালানি সংকটের মধ্যেও হা-মীম গ্রুপের পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। গত তিন বছরে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪০০টির বেশি ছোট পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেসব কারখানার কিছু অর্ডার হা-মীমের হাতে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এড়াতে চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়া কিছু ক্রেতার অর্ডারও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। হা-মীম গ্রুপের দৈনিক জ্বালানি বিল আগে যেখানে প্রায় ২ লাখ ডলার ছিল, এখন তা বেড়ে ৩ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন। ফলে ব্যয় সামলাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
হা-মীমের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল মঈনের কার্যালয়ে কম্পিউটারের একটি স্প্রেডশিটে কর্মীদের ঘণ্টাভিত্তিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার হিসাব রাখা হয়। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে পড়লে ব্যবস্থাপকেরা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেন।
মঈন বলেন, ‘হয়তো তাঁর মেশিনে কোনো সমস্যা হয়েছে। হয়তো তিনি ক্লান্ত ছিলেন।’ তবে নিয়মিতভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে তাঁদের পরিবর্তে নিয়োগ দেওয়া হয় নতুন কর্মীদের। প্রতিদিন সকালে চাকরির আবেদনপত্র হাতে বহু মানুষ কারখানার ফটকে ভিড় করেন।
মঈনের ভাষায়, ‘আমরা হয়তো কোনো ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি। কিন্তু সে কারণেই উৎপাদনশীলতার সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই।’
আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা পাকিস্তানের মতো দেশে নিয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
শুধু নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। পশ্চিমা অনেক ব্র্যান্ড জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে কারখানায় কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, সেটিও ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাকের বাইরে অর্থনীতির নতুন খাত গড়ে তোলাও সহজ নয়। বাংলাদেশ ওষুধ ও চামড়াশিল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে প্রবেশের লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু এসব খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কঠিন। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকলে বড় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করাও কঠিন।
গত মাসে বাংলাদেশ নতুন জ্বালানি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এতে নতুন সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন করে মোট ৩০০টি অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি কূপ ইতিমধ্যে খনন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমরা এই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট। তিন থেকে চার বছরের মধ্যে হয়তো আর বিদ্যুৎ সংকট থাকবে না।’
তবে আপাতত বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য স্বস্তির লক্ষণ খুব একটা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, শহর ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। রিয়াদে এসব হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন হামলা আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘বর্তমান সরকারের জন্য পরিস্থিতি কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে অনেক ভালো হতো।’
প্রতিদিন ২২ হাজার তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির এই কর্মকর্তা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ওপর জ্বালানি ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au