বন্যার পানিতে ডুবে থাকা সড়কে মাছ ধরছেন বাসিন্দারা। ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীর হাট ইউনিয়নের উত্তর শ্রীপুর গ্রামের সড়কে। ছবিঃ সংগৃহীত
ঢাকা, ১১ জুলাই-
দক্ষিণাঞ্চলের দুই জেলা নোয়াখালী ও ফেনীতে টানা বৃষ্টি, নদীর বাঁধ ভাঙন আর অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। দুই জেলাতেই দ্রুতগতিতে পানি ঢুকে পড়েছে নিচু এলাকায়, ডুবিয়েছে হাজারো গ্রামের ঘরবাড়ি, রাস্তা ও খামার। নোয়াখালীর ছয়টি উপজেলায় দুই লাখেরও বেশি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন; আর ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে ভুগছেন কয়েক লাখ মানুষ। কোথাও কোথাও এখনো বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন, আর প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষ একসঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দুর্যোগ মোকাবিলায়।
নোয়াখালী: ছয় উপজেলার দুই লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত
নোয়াখালীতে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ছয়টি উপজেলার অন্তত দুই লাখ তিন হাজার ১০০ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জেলার ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছেন এক হাজার ৪১৯ জন মানুষ এবং তাদের সঙ্গে ২৪০টি গবাদি পশু। জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ জানিয়েছেন, জেলার ৪৬৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নোয়াখালী সদর, কবিরহাট ও সেনবাগ উপজেলা। নোয়াখালী সদরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৩০ হাজার, সেনবাগে তিন হাজার ৮৭০, কবিরহাটে তিন হাজার ৬৫০, কোম্পানীগঞ্জে তিন হাজার ৫২০, সুবর্ণচরে ৫০০ এবং হাতিয়ায় ৩০০ পরিবার। এছাড়া সম্পূর্ণ ধসে গেছে একটি ঘর এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ৪০টি ঘরবাড়ি। জেলার ছয়টি উপজেলার ৫৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জেলার জেলা শহর মাইজদীসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় সড়ক ও বাড়িঘর এখনো পানির নিচে। জলাবদ্ধতার কারণে কর্মজীবী মানুষ এবং যানবাহনের চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পানি দ্রুত নামছে না। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ করছেন এবং দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফেনী: নদীর পানি কমলেও ভোগান্তি কাটেনি
ফেনীতে ভারী বর্ষণ কিছুটা কমলেও মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর বাঁধ ভেঙে বন্যা ছড়িয়ে পড়েছে পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার শতাধিক গ্রামে। নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকে দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ভারী বর্ষণে নদীর বাঁধের অন্তত ২১টি স্থান ভেঙে যাওয়ায় এই বিপর্যয় ঘটেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫৮ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, আর শুক্রবার থেকে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রয়েছে, ফলে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
দুর্গত মানুষজন জানিয়েছেন, বাঁধ ভেঙে বারবার এভাবে প্লাবিত হওয়া এখন যেন নৈমিত্তিক দুর্যোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃদ্ধা রেজিয়া বেগম বলেন, ‘গেল বছরের বন্যার বছর না ঘুরতেই আবারও পানিতে ডুবতে হলো। সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে।’ স্থানীয়রা বলছেন, টেকসই বাঁধ ছাড়া এ দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান নেই।
ফেনী জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, পরশুরামে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, ফুলগাজীতেও কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। তবে ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদরের নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকছে। চার উপজেলায় এখন পর্যন্ত ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় সাত হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন, আর ২০ হাজারের বেশি মানুষকে খাবার বিতরণ করা হয়েছে।