মেলবোর্ন ১৭ জুলাই- ২০২৫ সালের জুলাই মাসে গোপালগঞ্জে সংগঠিত ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে, তা নিছক একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত, ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়—যেখানে ধর্ম, ইতিহাস, সেনা–ক্ষমতা এবং প্রোপাগান্ডার ভয়ঙ্কর সংমিশ্রণে জন্ম নিয়েছে এক নতুন ফ্যাসিবাদী বাস্তবতা। এ প্রবন্ধে আমরা দেখাবো, কীভাবে সেনাপ্রধান ওয়াকারুজ্জামান মীরজাফর ও মামলুক সিন্ড্রম এ দুইয়ের যে সংশ্লেষ তার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন এবং গোপালগঞ্জ হত্যাকাণ্ড বিশ্ব ইতিহাসের হিটলার, মুসোলিনি, তালেবান কিংবা সিরিয়ার মতো ভয়াবহ উদাহরণগুলোর ছায়া বহন করে।
১. গোপালগঞ্জ হত্যাকাণ্ড: ফ্যাসিবাদী প্রতিকী নাটক
‘জুলাই সমাবেশ’ নামের কর্মসূচিকে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ নাম দেওয়া হয়েছিল একটি উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে। এই নামটি ‘March on Rome’ (মুসোলিনি, ১৯২২) এবং ‘March to Lahore’ (জিন্নাহ, ১৯৪০) এর মত একটি সামরিক–প্ররোচিত প্রতীকী বিজয় অভিযানকে ইঙ্গিত করে।
এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল:
- বঙ্গবন্ধুর মাজার এলাকায় চরম উস্কানি সৃষ্টি
- ‘আওয়ামী লীগ’ ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারী শক্তিকে প্রতিহত করে তাদের উপর দোষ চাপানো
- সংঘর্ষ ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে “রাষ্ট্রীয় দমন” দেখানো
- এর পরবর্তী ধাপে নির্বাচন বাতিল বা সেনা–পৃষ্ঠপোষিত দীর্ঘমেয়াদি শাসনের পথ তৈরি
স্থানীয় সংবাদ সূত্রে জানা যায়, গোপালগঞ্জে ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং অগণিত আহত হয়েছে সেনাবাহিনী ও পুলিশের গুলিতে। এই মুহূর্তে সেনাবাহিনীর নির্মম ক্র্যাকডাউন চলছে অবলীলায়।
দেখা গেছে, এনসিপি নেতাদের কেউ কেউ গোপালগঞ্জে গিয়েও তাঁদের প্রায় জনশুন্য জনসভায়ও বতৃতা শুরু করেছেন “মুজিববাদের কবর” রচনা করার প্রত্যয় ঘোষনা করেছেন; বলেছেন, এ কবর রচনা না করে তাঁরা জীবিত ফিরে যাবেননা (সার্জিস আলমের বক্তব্যটি দ্রষ্টব্য)। এই জাতীয় বক্তব্য দেয়ার পরও যদি অনেক সুশীল মানুষেরা উস্কানির অভাব খোঁজেন তবে খুব বেশী কিছু বলার থাকেনা; কেবল এই সুশীলদের মননে লুকিয়ে থাকা রাজাকার দর্শনটি চেনা যায় অনায়াসে যখন তাঁরা এনসিপি’র নেতাদের রক্ষার আবেদন জানান, কিন্তু গোপালগঞ্জের নিরীহ মানুষ হত্যার প্রতিবাদ জানান না, অথচ এঁরাই গত জুলাইতে “নিরীহ” মানুষ হত্যার প্রতিবাদে মুখর ছিলেন। এই দ্বিচারিতা বাংলার মানুষ বারবারই দেখছে।
২. এনসিপি ও মৌলবাদী কাঠামো
NCP নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ভাষা মুখে ধর্মীয় স্বাধীনতা, কিন্তু বাস্তবে:
- কওমি মাদ্রাসা ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট উগ্রবাদীদের সক্রিয় সমর্থক
- বিভিন্ন বক্তব্যে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর মাজার ভাঙার হুমকি
- ফেসবুক ও ইউটিউবে ২০২৫ সালের জুন–জুলাইয়ে যে ভিডিও বার্তাগুলো প্রচার করা হয়, তাতে দেখা যায় তারা “মাজার ও বেদাত” বিরুদ্ধে “ইসলামী বিপ্লব” দাবি করছে
এদের আসল কৌশল ছিল উস্কানি → সংঘর্ষ → দোষ চাপানো → নির্বাচন স্থগিত → সেনা হস্তক্ষেপ। এই স্কিমটি এই মুহূর্তে এদের নিজেদের স্বার্থে নির্মমভাবে চালু রেখেছে তারা।
৩. পলাশী ১৭৫৭ থেকে ঢাকা ও গোপালগঞ্জ ২০২৪-২০২৫: ওয়াকারুজ্জামান ও মীরজাফর সিন্ড্রোম
ওয়াকারুজ্জামান পুরো ঘটনাপ্রবাহে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বদলে, সময় সময় ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন: যেমন,
🔗 “I am warning you: Bangladesh Army chief tells politicians…”
(Economic Times, 2025)
🔗 “Army chief vowed to back the interim government ‘come what may’”
(Reuters, 2024)
এই ভাষা কোনো পেশাদার সেনাবাহিনীর নয়, বরং একটি গভীর ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত আদর্শিক সেনাপতির প্রতিচ্ছবি। এই কথাগুলো বলার সময় সেনাপ্রধান আসলে রাজনৈতিক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন; এটি তিনি করতে পারেন কি?মনে রাখতে হবে, ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলের আগে জেনারেল এরশাদও এ জাতীয় হুমকি প্রদান করেছিলেন দেশবাসীকে।
একটি জোরালো রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক তুলনার কাঠামোয় আমি ওয়াকারের ভূমিকাকে “মীর জাফর সিন্ড্রোম” বলি যেখানে অতীতের বিশ্বাসঘাতকতা এবং বর্তমানের ষড়যন্ত্র একসূত্রে গাঁথা হয়। মনে রাখতে হবে, পলাশী থেকে গোপালগঞ্জ ইতিহাসের সেই শিখাটিই আমাদের দেয় যে, আসলে বিশ্বাসঘাতকতা শুধু রঙ বদলায়, চরিত্র বদলায় না। দেখা যাক, এই মিলটি আমরা পাই কিনা ইতিহাসের আলোকে।
মীর জাফর সিন্ড্রোমঃ তুলনামূলক বিশ্লেষণ: একই প্রতিজ্ঞা, একই বিশ্বাসঘাতকতা, আলাদা সময়!
| উপাদান |
পলাশী (১৭৫৭) |
ঢাকা ২০২৪ এবং গোপালগঞ্জ (২০২৫) |
| ✋ প্রতিজ্ঞা |
মীর জাফর কোরআন ছুঁয়ে বলেছিলেন নবাব সিরাজকে রক্ষা করবেন |
ওয়াকার শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন: “সব ঠিক করে দেব” (৪ আগস্ট ২০২৪) |
|
⚠️ প্রকৃত ভূমিকা
|
ব্রিটিশদের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করে নবাবকে পরাজিত করেন |
সেনাবাহিনীকে দিয়ে জঙ্গিদের রক্ষায় ব্যবহার করেন, গোপালগঞ্জে আওয়ামী নেতাকর্মীদের হত্যা হতে দেন |
| 🎯 লক্ষ্য |
বাংলার শাসনক্ষমতা দখল |
বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার ধ্বংস ও ক্ষমতায় ‘অরাজনৈতিক–উগ্রবাদী’ শক্তি বসানো |
| 💣 ফলাফল |
বাংলা স্বাধীনতা হারায়, ব্রিটিশ উপনিবেশ শুরু হয়; বেণিয়া পুঁজিবাদী স্বার্থ সংরক্ষিত হয় |
নির্বাচন স্থগিত, মৌলবাদ মাথাচাড়া দেয়, স্বাধীনতা–চেতনা কোণঠাসা হয়; নব্যউদারনীতি ভিত্তিক পুঁজির স্বার্থ সংরক্ষন |
| 📖 ইতিহাসের শিরোনাম |
“বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর” |
“মীর জাফরের উত্তরসূরি ওয়াকার”
|
মূলত পলাশীতে মীর জাফর কোরআন ছুঁয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্রিটিশদের হাতে বাংলা বিক্রি করেছিলেন। ওয়াকারুজ্জামান ২০২৪ এ হাসিনার পক্ষে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর তারপরে জঙ্গিদের হাত শক্ত করে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন মৌলবাদী গোষ্ঠীকে। পাঁচই আগষ্ট ২০২৪ এ তিনি জাতিকে তাঁর ওপর আস্থা রাখতে বলেছিলেন তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে, কিন্তু এরপর ক্ষমতাসীন মৌলবাদী গোষ্ঠী ও তাদের দোসররা ক্রমাগত মব চালিয়ে আওয়ামী লীগের নিরীহ নেতাকর্মী, সংখ্যালঘু, প্রগতিশীল মানুষদের হত্যা করে ও নির্যাতন চালায়; বাঙ্গালীর ইতিহাসের অংশ বত্রিশ নম্বর এবং স্বাধীনতার প্রতিকগুলোকে ধ্বংস করে; অথচ এই সেনাপ্রধান এসব বিষয়ে বারবারই প্রতারনার আশ্রয় নিয়েছেন। সর্বশেষ এই ২০২৫ এর গোপালগঞ্জে তিনি তাঁর মুখোশ পুরোপুরি উন্মুক্ত করেছেন; আওয়ামী কর্মীদের বুকে গুলি চালিয়েছেন তিনি নির্দ্বিধায়। এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী নির্বিচারে গোপালগঞ্জবাসীর ঘরে ঘরে ঢুকে তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। এইটি প্রমান করে, পলাশীর মীর জাফরের ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে—এইবার ইউনিফর্মে, অন্য নামে। মীর জাফর কোরআন ছুঁয়ে প্রতারণা করেছিলেন; আর ওয়াকার ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায়।
৪. মীরজাফর সিন্ড্রোম ও মামলুক সিন্ড্রম: বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনা ও ধর্মের সংমিশ্রণ
বাংলাদেশের ইতিহাসে মীরজাফর সিন্ড্রোমের সাথে মামলুক সিন্ড্রমের একটি একক সংশ্লেষ দেখা যায়। মামলুক সিন্ড্রোম বলতে বোঝায় সেই সামাজিক–রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেখানে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং নিজেদের ‘রক্ষাকর্তা’ রূপে প্রতিষ্ঠা করতে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। জনগণ ধীরে ধীরে প্রতিবাদ করার ক্ষমতা হারায়।
ইতিহাসে মামলুক সিন্ড্রোমের উৎস উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ভারতের দিল্লী সলতানাত পর্যন্ত ছড়ানো। মামলুক বংশ (১২০৬–১২৯০) ছিল মূলত দাস সৈন্যদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজবংশ। কিছু উল্লেখযোগ্য সুলতান:
- কুতুবউদ্দিন আইবক
- ইলতুৎমিশ
- রাযিয়া সুলতানা
- গিয়াসউদ্দিন বালবান
এদের অধিকাংশই ‘গোলাম’ থেকে সুলতান হয়ে উঠেছিল—আজকের দিনের অনেক সেনা শাসকের মতোই। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের অনুগত একটি নিরাপত্তা সংস্থা হওয়া সত্ত্বেও বারবারই রাষ্ট্রের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে শরিক হয়, এবং নিজেদের “রক্ষাকর্তা” হিসেবে দেখিয়ে পরে ক্ষমতা দখল করে বা নতুন কোন পুতুল ডানপন্থী গোষ্ঠীকে ক্ষমতাসীন করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এরা প্রায়শ ধর্মভিত্তিক উগ্র মৌলবাদী রাজনীতির মেন্টর হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে মীরজাফর এবং মামলুক সিন্ড্রোমের যে সংশ্লেষ দেখা যায় তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে, এই সংশ্লেষ কোন না কোন পরাশক্তির স্বার্থ রক্ষা করার বিনিময়ে ক্ষমতা দখল করে। পলাশীতে ছিলো মীরজাফর আলী খান ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা দেখেছিলেন বেনিয়া পুঁজির (Merchant Capital) স্বার্থ, আর বর্তমান সময়ে ওয়াকার এবং তাঁর দোসররা হয়েছেন নব্যউদারনীতি ভিত্তিক পুঁজির (Neoliberal Policy based Capital) সেবাদাস। এই বাংলাদেশে সেই পঁচাত্তোর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই বিষয়টি মানে কখনো আর্থিক পুঁজিবাদ, আবার কখনোবা নব্যউদারনৈতিক পুঁজির স্বার্থ বারবারই রক্ষা করতে দেখা গেছে মীরজাফরের উত্তরসূরিদের। বর্তমান সেনাপ্রধান ওয়াকারুজ্জামানও মুলতঃ সেটিই করে চলেছেন শুরু থেকে। ভেবে দেখুন, আওয়ামী লীগের পতনে যে প্রতারনামুলক আন্দোলনটি হয়েছিলো সেটির পেছনে ছিলো শক্তিশালী ডিপষ্টেটের স্বার্থজনিত ভূমিকা যেটি আজ ইতিহাসের জন্য একটি ওপেন সিক্রেট উপাদান যা ভবিষ্যৎ বিশ্লেষনে কাজে লাগবে।
৫. ওয়াকার কি মোল্লা ওমর হতে চান?
ওয়াকারুজ্জামান ও মোল্লা ওমরের মধ্যে সরাসরি চরিত্রগত বা আদর্শিক সাদৃশ্য না থাকলেও, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে ধর্ম, সেনা ও রাষ্ট্রের অস্থিরতাকে ব্যবহার করার কৌশলগত মিল রয়েছে। এ ধরনের মিলকে “Ideological Power Seizure through Strategic Destabilization” বলা যায়, যেটিকে মামলুক সিন্ড্রম বা মোল্লা ওমর মডেল হিসেবে ধরা যায়।
নিচে ওয়াকার ও মোল্লা ওমরের মধ্যে মিলগুলোর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।
📊 তুলনামূলক ছক: ওয়াকারুজ্জামান বনাম মোল্লা ওমর
| উপাদান |
🧔♂️ মোল্লা ওমর (আফগানিস্তান, ১৯৯৬–২০০১) |
⚔️ ওয়াকারুজ্জামান (বাংলাদেশ, ২০২৪–২৫) |
|
🎯 উদ্দেশ্য
|
ইসলামী আমিরাত প্রতিষ্ঠা (তালেবান শাসন) |
গণতন্ত্র পতন ও ধর্মীয়–ডানপন্থী শাসনের সহায়তা |
|
🕌 ধর্মের ব্যবহার
|
শরিয়া ভিত্তিক শাসন, মাজার ভাঙা, মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ |
বঙ্গবন্ধুর মাজারকে টার্গেট করা মবকে প্রশ্রয়, কওমি ও জামায়াতপন্থীদের রক্ষা |
|
⚔️ ক্ষমতা দখলের উপায়
|
গৃহযুদ্ধের মধ্যে তালেবান ক্ষমতা নেয় |
নির্বাচনী সরকার ভেঙে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা |
|
🛡️ আত্মপ্রকাশ
|
জনগণের রক্ষক হিসেবে হাজির হন |
শেখ হাসিনাকে “সব ঠিক করে দেবো” বলে আশ্বাস দেন |
|
📉 বাস্তব কার্যকলাপ
|
তালেবানদের উগ্র আদর্শ বাস্তবায়ন, ঐতিহ্যবিরোধী আচরণ |
গোপালগঞ্জে আওয়ামী কর্মীদের হত্যা, জঙ্গিবাদ রক্ষা, নির্বাচন স্থগিতের পথ তৈরি |
|
📚 আদর্শিক দর্শন
|
ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম |
মৌলবাদের প্রতি নীরব সহানুভূতি; কথায় গনতন্ত্র, কাজে উগ্রবাদপন্থা |
|
🧩 আন্তর্জাতিক প্রভাব
|
পাকিস্তান ISI, সৌদি অর্থায়ন |
মার্কিন deep state + পাকিস্তানি ভাবধারা + সৌদি প্রভাব
|
নাওমি ক্লাইনের মতে, যখন কোনো সামরিক বা আদর্শিক শক্তি ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার’ দাবি করে, অথচ বাস্তবে ধর্মীয় উগ্রবাদকে শক্তিশালী করে, তখন সে নিজেই আদর্শিক ফ্যাসিবাদের বাহক হয়ে ওঠে।” এই বক্তব্যটির সাথে ওয়াকারের শুরুর প্রতিজ্ঞা (৫ আগষ্ট) ও তাঁর এবং তাঁর সমর্থিত সরকারের পরবর্তি কর্মকান্ডের মিল পাওয়া যায় কিনা সেটি পাঠক বিচার করবেন। আসলে ওয়াকার শুধু মীরজাফর নন, তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের বাংলাদেশের মোল্লা ওমর – তিনি ইউনিফর্ম পরে গণতন্ত্রের কবর খুঁড়ছেন, ধর্মান্ধদের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর সমাধি ধ্বংসের রাস্তা খুলে দিচ্ছেন। একজন তালেবান বানিয়েছিল কাবুলকে মৃত্যুপুরী, আরেকজন বানাতে চায় গোপালগঞ্জকে গোরস্থান। মোল্লা ওমর কাবুলে যা করেছিলেন, ওয়াকার আজ তা বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমিতে তাই করছেন।
ওয়াকার যদি ধর্মীয় উগ্রবাদী মবকে প্রতিরোধ না করে উল্টো তাদের কাজে পরোক্ষ সহায়তা দেন, তবে তিনি ঠিক সেই পথেই হাঁটছেন যেখানে একসময় তালেবান রাষ্ট্র বানিয়েছিল “আফগানিস্তান“—কিন্তু তাতে ছিল না মানবতা, গণতন্ত্র, বা ইতিহাস।
৫. গোপালগঞ্জের ঘটনার আন্তর্জাতিক তুলনা
আধুনিক বিশ্বে শুধু উল্লেখিত সংশ্লেষটি নয়, ইতিহাসের আরো অনেক ঘটনার সাথে বর্তমান বাংলাদেশী শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা সংঘটিত অনেক ঘটনার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নীচে কয়েকটি উল্লেখ করা গেলো।
|
দেশ
|
কী ঘটেছিল |
কৌশল |
ফলাফল |
| জার্মানি (১৯৩৩) |
Reichstag আগুন |
কমিউনিস্টদের দোষে Crackdown |
হিটলারের একনায়কতন্ত্র |
| ইতালি (১৯২২) |
March on Rome |
জাতীয়তাবাদ ও সংঘর্ষ |
মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ |
| আফগানিস্তান (১৯৯৬) |
মাজার ধ্বংস |
শরিয়া ও মোল্লাতন্ত্র |
তালেবান শাসন |
| সিরিয়া (২০১১) |
উস্কানি → দমন |
ধর্মীয় বিভাজন |
গৃহযুদ্ধ ও হস্তক্ষেপ |
| বাংলাদেশ (২০২৫) |
মার্চ টু গোপালগঞ্জ |
বঙ্গবন্ধুবিরোধী মব → সেনা দমন |
নির্বাচন পেছানো, সেনা কর্তৃত্ব?
|
৬. উপসংহার: আজকের ওয়াকার, আগামীকালের খলিফা?
গোপালগঞ্জে যেভাবে একটি ধর্মীয়–রাজনৈতিক মবকে প্ররোচিত করে বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলে সহিংসতা ঘটানো হলো এবং সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যেভাবে গুলি চালিয়ে আবার আওয়ামী লীগের ঘাড়ে দোষ চাপানো হলো—তা একটি অস্থিতিশীলতার সৃষ্টিশীল (Constructive Destabilization) মডেল। এই মডেলেই আফগানিস্তানে তালেবান, পাকিস্তানে মোশাররফ এবং মিসরে সিসি উঠে এসেছিল। মনে রাখতে হবে, যে রাষ্ট্রে মাজার ভাঙা হয়, সেখানে ইতিহাস নয়—মৌলবাদ টিকে থাকে। আর যে সেনাপ্রধান ধর্ম নিয়ে হুঁশিয়ারি দেয় বা মৌলবাদী জঙ্গিদের হয়ে কাজ করে সে আর সংবিধানের রক্ষক নয়—সে হয় রাষ্ট্রের কবর খোঁড়ার যন্ত্রী। আর গোপালগঞ্জে গুলি চলেছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বুকে—ওয়াকারুজ্জামান সেই স্বপ্নের হত্যাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মামলুকরা ফিরেছে আবার—নতুন পোশাকে, পুরনো খেলায়।
ডঃ শ্যামল দাস (ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র)