বাংলাদেশ

মেলবোর্নে সেতু সাহার ঘরে আজ শুধুই কান্না!

  • 10:34 pm - July 17, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৫৩ বার
দীপ্ত সাহা গোপালগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে তার কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন ১৭ জুলাই ২০২৫- দরজা খুলতে একটু দেরি হলো। বাইরে আমরা অপেক্ষা করছি কয়েকজন। উদ্দেশ্য, গতকালকে গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হওয়া দীপ্ত সাহার বড় বোনের বাসায় গিয়ে একটু সান্ত্বনা দেওয়া। ভিতরে ঢুকেই শুনতে পেলাম অঝোরে কান্নার শব্দ—তিনি আর কেউ নন, সদ্য নিহত দীপ্ত সাহার বড় বোন সেতু সাহা। 

সেতু সাহা প্রিয় ছোট ভাইয়ের শোকে প্রায় উন্মাদ হয়ে পড়েছেন। গতকাল থেকে এক মুহূর্ত ঘুমাতে পারেননি। কিছু খেতেও পারছেন না—মুখে খাবার তুলতেই দীপ্তর মুখ ভেসে ওঠে চোখে। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কথা বলতে পারছেন না। ভাঙ্গা গলায় কেবল বলছিলেন, “আমার নিষ্পাপ ভাইটাকে আমি আর কোনদিন ফিরে পাব না! মা তো পাগলপ্রায়। আমরা এই শোক সামলাব কিভাবে?”

দূর মহাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে বড় বোনের চোখে নেমেছে অনিদ্রার কালো ছায়া। সেতু সাহা বলছিলেন, “আমার ভাই কখনো রাজনীতি করেনি। মা তার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছিলেন, ঘরও সাজিয়েছিলেন খুব সুন্দর করে। অনেক সংগ্রামের পর একটু সুখের মুখ দেখার কথা ছিল আমাদের। ঠিক তখনই আমার ভাইটা চলে গেল চিরতরে।”

দীপ্ত সাহার বড় ভাইও নাকি তাকে বারবার নিষেধ করেছিলেন সেদিন দোকানে না যেতে। কিন্তু কে জানত সাধারণ জনতার উপর এভাবে নির্বিচারে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ে কেড়ে নিবে টগবগে যুবক  দীপ্ত সাহার তাজা প্রাণ?

মাত্র ১৪ বছর বয়সে দীপ্ত তার বাবাকে হারান। মায়ের অশেষ কষ্ট আর সংগ্রামের মাঝেই বড় হয়েছে সে। বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসা দুই ভাই মিলে সামলাচ্ছিলেন।

সেতু সাহার স্বামী, রাতুল বিশ্বাস জানান, “গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ৪৪ মিনিটে ওর সাথে কথা হয়েছিল আমার। সাবধানে থাকতে বলেছিলাম। হঠাৎ করেই কলটা কেটে যায়। ঠিক তখনই গুলি এসে দীপ্তর শরীর ভেদ করে—এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।”

রিকশায় করে তাকে গোপালগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে শরীরের রক্ত ঝরে গিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মুখে ছিল শেষ কিছু কথা—“আমার কী হবে?” 

কিন্তু চিকিৎসা শুরুর আগেই দীপ্ত সাহা দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। সমস্ত মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন দীপ্ত সাহা।

আরেকটি স্বপ্ন, আরেকটি সম্ভাবনা হারিয়ে গেল নোংরা রাজনীতির নির্মম যাতাকলে। একজন নির্দোষ যুবক শুধু ভুল জায়গায় ভুল সময়ে থাকার কারণে গুলিতে প্রাণ হারাল।

কে করবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার? তারা তো বিচার চাইতেও পারবেনা! কার কাছে বিচার চাইবেন? যেখানে সরকার পরিবারকে গিয়ে একটু শান্তনা এবার কথা, সে জায়গায় সরকার আগে থেকেই ঘোষণা করেছে আন্দোলনকারীরা দুষ্কৃতিকারী এ বিষয়ে আলোচনা করলে সেতু সাহা এবং রাতুল বিশ্বাস বলেন,

আমরা বিচার চাই না, আমরা ক্ষতিপূরণ চাই না! আমাদের পরিবারের সদস্যরা পরবর্তীতে আর কোন ঝামেলা বা হেনস্তার শিকার হতে হবে কিনা এই নিয়ে এখন বড় উৎকণ্ঠার আর আশংকার জায়গা।”

এই মর্মান্তিক  ট্রাজেডির এখানেই শেষ নয়। দাহক্রিয়ার সময়ও মিলেনি শান্তি। গভীর রাতে যখন তার মরদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনও সারাক্ষণ উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে থাকতে হয় তাদের সকলকে। মধ্যরাতে শ্মশান থেকে বাড়িতে সবাই ঠিকঠাক মতো পৌঁছাতে পারবে কিনা তা নিয়ে ছিল চরম আতঙ্ক। কারণ গোপালগঞ্জ শহরে ততক্ষণে কারফিউ অর্থাৎ ১৪৪ ধারা শুরু হয়ে গেছে। চরম উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কের মধ্যে শেষকৃত্য সম্পন্ন ঘরে ফিরেন পরিবারের সদস্যরা।

উল্লেখ্য, দীপ্ত সাহা গোপালগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে তার কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না। পরিবারের গার্মেন্টস দোকানই ছিল তাদের জীবিকার ভরসা।

আজ তার পরিবার নিঃস্ব—মা, বোন, ভাই সবাই এক শূন্যতায় নিমজ্জিত। আর দীপ্ত সাহা? সে আজ ইতিহাসের আরেকটি নিষ্ঠুর সত্য—যেখানে প্রশ্ন নেই, উত্তর নেই, শুধু থেকে যায় কান্না আর শোক।

গোপালগঞ্জ শহরের চৌরঙ্গি এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে ঘিরে বুধবার দুপুরে যে সংঘর্ষ বাধে, তাতে এখন পর্যন্ত কতজন মৃত্যুবরণ করেছে তার সঠিক হিসেব সরকারি ভাবে নেই। নেই কোন গণমাধ্যমে। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন তরুণ ব্যবসায়ী দীপ্ত সাহা। 

প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিক্ষুব্ধ জনতা ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি ছোড়ে, তখনই দীপ্তসহ অনেকে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুদি দোকানি বলেন, “ওরা কেউই রাজনীতির লোক না—দোকানপাটের মানুষ। গুলি খেয়ে সামনে পড়ে গেল।”

আর মেলবোর্নের বোন সেতু সাহাকে অগণিত বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান সামাজিক মাধ্যমে শোক জানাচ্ছেন, বাড়িতে গিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এই শোক সামলানো অনেক কঠিন। যার যায়, সেই বুঝে প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা৷ ভাইকে হারিয়ে বোনটি করছে গগনবিদারী চিৎকার, তার চিৎকার ভ্যূলোক ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দ্যূলোকে৷ 

বাংলাদেশের বাতাসে এখন স্তব্ধতা, কাঁদো কাঁদো মুখে জনতা শুধু জানতে চাইছে—কার গুলিতে প্রাণ গেল এই তরুণদের? কার হাতের অপরাজনীতি ঢেকে দিল তরুণদের উদীয়মান ভবিষ্যৎ?

সইতে পারছি না—উপস্থিত সকলের চোখেও জল নেমে আসে৷ এখানেও যেন কালো মেঘ নেমে এসেছে। মেলবোর্নেও চলছে শোকের মাতম। 

এই শাখার আরও খবর

বিজয়া দশমীতে সিঁদুরের রঙে আনন্দ, দেবী বিদায়ে বিষাদ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  ছয় দিনের পূজা-অর্চনা শেষে বিদায়ের পালা দেবী দুর্গার। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন, দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জনের মধ্য…

‘পাপের লাশ দেশে আসুক চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন বিএনপির এমপি

সৌদি আরবে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিরোধিতা করে ‘পাপের লাশ দেশে আসুক চাই না’ মন্তব্য করেছিলেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের…

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কি ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে?

সামরিক কৌশল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে একসঙ্গে চাপে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত, আঞ্চলিক মিত্রদের…

মাগুরায় যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ

মাগুরা পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সাকের হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর ৬টার দিকে মাগুরা বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টার…

ভক্তি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মহিমায় সিডনিতে দর্পণের শারদীয় দুর্গোৎসব

শতদল তালুকদার, সিডনি- শরতের স্নিগ্ধ আবহ, দেবীবন্দনার পবিত্র অনুরণন আর বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের আবাহনে সিডনিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। দর্পণ কালচারাল অ্যান্ড রিলিজিয়াস…

কুমিল্লাজুড়ে মাদকের ভয়াবহ থাবা, ২০০ হটস্পটে চলে বেচাকেনা

কুমিল্লার সীমান্ত দিয়ে দেদারছে ঢুকছে মাদক। পরে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। জেলার ১৮টি থানায় অন্তত ২০০টি হটস্পটে চলছে মাদক কেনাবেচা। সীমান্তের অর্ধশতাধিক পথ ব্যবহৃত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au