চীন ইয়ারলুং জাংবো নদীর উপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ জুলাই-
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ব্রহ্মপুত্র নদে একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। গত শনিবার তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নিংচি শহরে মেইনলিং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এই ঘোষণা দেন।
এই প্রকল্পে মোট পাঁচটি ক্যাসকেড অর্থাৎ একের পর এক পাঁচটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় এক লাখ দুই হাজার কোটি চীনা ইউয়ান, যা প্রায় ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান। প্রকল্পটির বিদ্যুৎ সরবরাহ মূলত অন্য প্রদেশগুলোর জন্য হলেও সিজাংয়ের স্থানীয় চাহিদাও পূরণ করা হবে।
চায়না ইয়াজিয়াং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড এই প্রকল্পের নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে চীনা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি ছিল।
এই প্রকল্পটি শুধু একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, বরং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই এর প্রভাব ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের ওপরও পড়তে পারে। ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এই প্রকল্পকে “বোমার মতো ভয়ংকর” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “চীনের এই বাঁধ ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের চেয়েও বেশি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং এটি ভারতের জীবিকা ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।”
এভাবে ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের উচ্চাভিলাষী এই বাঁধ প্রকল্পকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোয় উদ্বেগ বাড়ছে।
হ্মপুত্রে চীনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজের প্রেক্ষাপট বেশ জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ। ব্রহ্মপুত্র নদ (চীনে যার নাম ইয়ালুংজিয়াং) দক্ষিণ এশিয়ার এক অন্যতম প্রধান নদী, যা তিব্বত থেকে শুরু হয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, তারপর বাংলাদেশ দিয়ে বয়েছে। এই নদী অঞ্চলের জন্য পানি ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীন দীর্ঘদিন ধরে ব্রহ্মপুত্রে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। এর মূল কারণ হলো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তবে চীনের এই উচ্চাভিলাষী বাঁধ প্রকল্পকে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ বড় উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে, কারণ নদীর পানির প্রবাহ পরিবর্তিত হলে সেখানে জীবনযাত্রা, কৃষি, পানির সরবরাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এই প্রকল্পকে ‘বোমার মতো ভয়ংকর’ বলার মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, এটি শুধু জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। চীন এই প্রকল্পের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে কড়া জলবিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যা রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
এছাড়া, ব্রহ্মপুত্রের ওপর এই ধরনের বাঁধ নির্মাণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা দেখা দিয়েছে, যেখানে নদীর পানি নিয়ে বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও মতপার্থক্য রয়েছে। চীনের এই প্রকল্প সেই প্রেক্ষাপটে চলমান জলবিন্যাস ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সুতরাং, চীনের ব্রহ্মপুত্রে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু একটি দেশীয় উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি একটি বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপটের অংশ, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশ এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।
সুত্রঃ এনডিটিভি