মিগ-২১ যুদ্ধবিমান; ছবিঃ সংগৃহীত
ভারতীয় বিমানবাহিনী তাদের দীর্ঘদিনের সঙ্গী মিগ-২১ যুদ্ধবিমানকে চিরতরে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ‘প্যান্থার্স স্কোয়াড্রনের’ অন্তর্গত শেষ মিগ-২১ বিমানটি আকাশে উড়বে শেষবারের মতো। এ যুদ্ধবিমান ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে মিগের ঐতিহাসিক অবদান
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকার গভর্নর হাউসে যে বিমান হামলা চালায়, সেটি মিগ-২১ দিয়েই। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর তৎকালীন কর্মকর্তা ভূপেন্দ্র কুমার বিষ্ণোই। তাঁর নেতৃত্বে গভর্নর হাউস লক্ষ্য করে ১২৮টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়। ওই আঘাতে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসন ভেঙে পড়ে, এবং মাত্র দুই দিন পর আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
ভারতে মিগ-২১-এর আগমন
১৯৬২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এক চুক্তির মাধ্যমে ভারত প্রথমবারের মতো ১২টি মিগ-২১ সংগ্রহ করে। এটি ছিল ভারতের প্রথম সুপারসনিক যুদ্ধবিমান, যার গতি শব্দের চেয়ে বেশি। শুধু বিমান কেনাই নয়, মিগের প্রযুক্তি রপ্তানির অধিকারও ভারত পেয়েছিল, যাতে নিজ দেশে এগুলো উৎপাদন সম্ভব হয়।
মিগ-২১ ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রায় সব সামরিক সংঘাতে অংশ নিয়েছে—১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ, এমনকি ২০১৯ সালের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এও মিগের অংশগ্রহণ ছিল। অভিনন্দন বর্তমান নামে এক পাইলট যিনি পাকিস্তানে বন্দি হন, তিনিও মিগ-২১ বাইসন ওড়াচ্ছিলেন।
যদিও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে মিগ-২১ ছিল উন্নত, তবে এটিকে ঘিরে শুরু থেকেই ছিল দুর্ঘটনার ইতিহাস। ১৯৬৩ সালে প্রথম দুর্ঘটনা ঘটে। এরপর প্রায় ৫০০টির বেশি মিগ ভেঙে পড়ে, মারা যান ১৭০ জন পাইলটসহ অন্তত ২০০ জন। এত বেশি দুর্ঘটনার কারণে একে বলা হতো “কফিন মেকার” বা “উইডো মেকার”।
মিগ-২১ বাইসন: শেষ প্রজন্ম
বছরের পর বছর ধরে মিগ-২১-এ নানা যান্ত্রিক উন্নয়ন আনা হয়েছে। সর্বশেষ সংস্করণ মিগ-২১ বাইসন। যদিও এর সীমাবদ্ধতা রয়েই গেছে—এতে শুধু একটি ইঞ্জিন, সীমিত অস্ত্র বহনক্ষমতা, কম জ্বালানি ক্ষমতা এবং আকাশে জ্বালানি ভরার সুযোগ নেই।
মিগ-২১ থেকে অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তা যেমন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস. সুজান একে তাদের কর্মজীবনের সূচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “মিগের মাধ্যমে অনেক স্মৃতি জড়িত। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিয়ে বিদায়ের সিদ্ধান্তটি সঠিক।”
মিগের জায়গায় আসছে ‘তেজস’
মিগ-২১-এর বিকল্প হিসেবে ভারত এনেছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘তেজস’ যুদ্ধবিমান। যদিও প্রকল্পটি অনেক দেরিতে এসেছে, তবুও হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে ৮৩টি তেজস বিমান সরবরাহ করবে।
মিগ-২১ শুধু ভারতের নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসেও এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ একটি মিগ-২১-এর প্রতিমূর্তি তুলে দেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের হাতে, যা যুদ্ধের যৌথ ইতিহাসকে স্মরণ করায়।
১৯৬৩ সালে ভারতে আসা এই যুদ্ধবিমান আজ ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। অগণিত বিজয়, বহু অপারেশন আর শোকাবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে মিগ-২১ বিদায় নিচ্ছে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে। বাস্তবতা এবং প্রযুক্তির বিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, এবার ভারত এগোচ্ছে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের পথে।