বেকা উপত্যকা, বালবেক, জিজিন, ঘাজিয়েহ, ব্রিটাল, নাসিরিয়া, মাহমুদিয়া ও খারদালি এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। ছবিঃ আল জাজিরা
মেলবোর্ন, ১ আগষ্ট- লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) দিনের বিভিন্ন সময়ে বেকা উপত্যকা, বালবেক, জিজিন, ঘাজিয়েহ, ব্রিটাল, নাসিরিয়া, মাহমুদিয়া ও খারদালি এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। বিশেষ করে বেকা উপত্যকার তাল্লেত আল-সুন্দুক পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। দক্ষিণ লেবাননের ঘাজিয়েহ এলাকায় এক গুদামে আগুন ধরে যায়। দেশটির জাতীয় বার্তা সংস্থা এসব হামলার খবর নিশ্চিত করেছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গ্যালান্ত এই হামলাকে ‘নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের হিজবুল্লাহর সবচেয়ে বড় কেন্দ্রের ওপর সহিংস পুনঃআক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসরায়েলি টিভি চ্যানেল ১২-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলে বা হুমকি দিলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
আল জাজিরা প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলার পর বিভিন্ন স্থানে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠে যাচ্ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন হিজবুল্লাহসহ সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের অস্ত্র লেবানন সেনাবাহিনীর কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, দেশের সব অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের মাটিতে অস্ত্রের মালিকানা একমাত্র সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে থাকতে হবে, তবেই আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা ফেরানো সম্ভব।
তবে হিজবুল্লাহর নেতা নাঈম কাসেম এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘যারা দেশ-বিদেশে আমাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার কথা বলছে, তারা আসলে ইসরায়েলের পক্ষেই কাজ করছে।’ হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, ইসরায়েল যখন পর্যন্ত লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে না যাবে এবং হামলা বন্ধ না করবে, তখন পর্যন্ত তারা অস্ত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করবে না।
অস্ত্র হস্তান্তর নিয়ে প্রেসিডেন্ট আউন বলেন, ‘আমি বারবার বলছি, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দাবি আসছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্যই। সীমান্ত রক্ষা, দখলদারিত্ব মুক্ত করা এবং সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র গড়াই আমাদের লক্ষ্য।’ একইসঙ্গে তিনি হিজবুল্লাহকে সমাজের ‘মূল স্তম্ভ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
গত বছরের ৮ অক্টোবর গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে হিজবুল্লাহ ইসরায়েল লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এরপর নভেম্বর মাসে এক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ। কিন্তু তারপরও প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েল লেবাননের বিভিন্ন অংশে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর উত্তরে অবস্থান নিতে এবং ইসরায়েলকে লেবাননের সব এলাকা থেকে সরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েল এখনও পাঁচটি কৌশলগত অঞ্চল দখলে রেখেছে।
প্রেসিডেন্ট আউন এ সময় ইসরায়েলের অবিলম্বে লেবানন ছাড়ার দাবি জানান এবং লেবাননের বন্দিদের মুক্তির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ধ্বংস নাকি স্থিতিশীলতা।’ যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভিত্তি ছিল
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাব, যেখানে বলা হয়েছিল, কেবলমাত্র লেবাননের সেনাবাহিনী ও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা দক্ষিণ লেবাননে অস্ত্র বহন করতে পারবে। কিন্তু এ প্রস্তাব বছরের পর বছর অকার্যকরই থেকে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, লেবানন সরকার একটি আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি দিক, এরপরই যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসবে ওয়াশিংটন।
আউন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে লেবানন কয়েকটি সংশোধিত প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, যেগুলোর ওপর মন্ত্রিসভায় আলোচনার কথা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, লেবাননে ইসরায়েলের সব ধরনের সামরিক অভিযান, বোমা হামলা ও টার্গেট কিলিং বন্ধ করতে হবে। দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণভাবে সরে যেতে হবে এবং বন্দি লেবাননিদের মুক্তি দিতে হবে।
প্রেসিডেন্ট আউন আরও বলেন, লেবানন চাইছে, আন্তর্জাতিক দাতারা সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বছরে ১ বিলিয়ন ডলার করে ১০ বছর অর্থায়ন করুক এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করা হোক।
এর বিনিময়ে লেবানন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, দেশের সকল সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করে সেগুলো সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সুত্রঃ আল জাজিরা