মহান হিন্দু যাত্রা: ১৯৪৭-২০২৫
মেলবোর্ন, ৫ আগষ্ট- মানবেতিহাসের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতি ঘটে এই ভূখণ্ডে, ১৯৪৭এ। মানবসৃষ্ট জোরপূর্বক চৌদ্দ পুরুষের ভিটে খোয়ানোর গল্প। এরপর ধারাবাহিকভাবে ৪৮, ৫০, ৫১, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৬২,৬৫, ৬৬…. অবশেষে ১৯৭১।
এবারে ১ কোটির অধিক মানুষ বাস্তুভিটা ছেড়ে ভারতের নানান শরণার্থী শিবিরে গিয়ে উঠল। আর দেশের ভেতর একটু নিরাপত্তার খোঁজে শহর গ্রামে ঠাঁই নাড়া হলো আরও কত কোটি মানুষ, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। কেবল সেবারই মানুষ মারা গেলো তিরিশ লাখ।
আসলে পাকি সামরিক জান্তার মেটিকুলাস ডিজাইনের মেজর পলিসি ছিল এই মাটি থেকে হিন্দু নির্মূল করা । অথচ ‘বাংলাদেশ” নামের এই রাষ্ট্রটা গত পঞ্চাশ বছরে কখনও স্বীকারই করলো না যে, তার ৩০ লাখের মধ্যে কমপক্ষে দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২০ লাখ শহীদের পরিচয় নিম্নবর্নের হিন্দু। আর ওই যে ১ কোটি শরণার্থী, তার ৮০ শতাংশ ধরলে ৮০ লক্ষ্যই হিন্দু জনগোষ্ঠী। তারমানে, রক্তের দামেই যদি স্বাধীনতা কেনা হয়, তবে সাড়ে সাত কোটির মধ্যে মাত্র দেড় কোটি হিন্দু, চড়া দামে তার মূল্য চুকিয়েছে।
তার আগে ৬৫তে রাষ্ট্র তার হাজার বছরের ভূমিপুত্র অমুসলিম নাগরিককে জাস্ট “শত্রু” ঘোষণা করে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেয়।
দখল ও উচ্ছেদের এই পাতানো খেলায়……. হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি,ধর্মান্তরকরণ, ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস, অগ্নি সংযোগ সবই অপহরণ কায়দা। নতুন যেটি এলো, তার নাম ” অপহরণ আঘাত লাগা “। এবং এই অনভূতিটি এতই স্পর্শ কাতর যে, কাশ ফুলের নরম ছোঁয়াতেও এটি দণ্ডবৎ সটান হয়। সত্যাসত্য বিচারেরও ফুরসত হয়না। “বিশেষ” জনতা টার্গেটের উপর আছড়ে পরে বানের জলের মত, টাইফুন-হারিকেন-টর্নেডোর মত। তার সামনে পুলিশ-র্যাব- বিজিবি- কোস্টগার্ড-নেভি- আর্মি সকলেই স্রেফ ‘প্রতিবন্ধী’ হয়ে যায়।
জাতি একটা নতুন টার্ম শিখল “শাতিম এ রাসূল” অর্থাৎ রসূল বা নবী মোহম্মদ মোস্তফা সম্পর্কে কটূক্তিকারী। এই যে আমি, কোনও গুণবাচক বিশেষণ বা কোনও প্রশংসাবাচক উপাধি ব্যতীত শুধু ওনার নামটা লিখলাম, তাতেই কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে এবং আমি “শাতিমে রসুল” হিসেবে বধযোগ্য হয়ে যেতে পারি। প্রথমে খেলাটা শুরু হবে ফেসবুকে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অর্থাৎ অনলাইনে, তার পর সরাসরি ইন পার্সন….. লাইভ। অ্যাকশন শুরু হয়ে গেলে আবার অনলাইনে, লাইভ টেলিকাস্ট।
এখন নতুন কোন কিছু শিখতে হলে তার টিউশন ফিসও দিতে হয়। কাজেই বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগন বিশেষ করে হিন্দুরা সেই টিউশন ফিস দিচ্ছে।
অনলাইন ভিত্তিক ধর্মানুভূতির ক্যাটাগরিতে প্রথম নাশকতা চলে রামুতে। ২০১২ সালে।এরপর পাবনায়, হোমনায়, নাসির নগরে : ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়ে, ছত্রছায়ায়। প্রথম ১০ বছরে এটি চলে ঢিমে তালে। টার্গেট করা হয় গ্রাম গঞ্জের মুক্তমনা, প্রগতিশীল লেখক- সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষকদের।এরপর এলো ২০২১ এ রক্তাক্ত শারদ। ২৮টি জেলায় একযোগে। ২১ থেকে ২৪ এই তিন বছরে সরাসরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্রয়ে ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকে।
আর গত ১ বছরে “শাতিমে রসুল” বিষয়ক মব ওরফে প্রেশার গ্রুপের নাশকতা মহামারির রূপ পেয়েছে। অগাস্ট টু অগাস্ট ২০টির অধিক।
সর্বশেষ ঘটনা রংপুরের গঙ্গাচড়ায়। প্রথম আলোতে প্রকাশিত হামলার পরে বেঁচে যাওয়া মালপত্র সরিয়ে নেবার ছবিটি ৭১এর ছবিগুলোকে মনে করিয়ে দিল।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও, এই তবে সংখ্যালঘুদের জন্য দায় ও দরদের নতুন বন্দোবস্ত ?
লেখকঃ অমিতভ দেউরি, সাংবাদিক