যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন; ছবি সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ আগষ্ট- বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া রাশিয়া এখনও ইউক্রেনে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, যার পেছনে রয়েছে দেশটির জ্বালানি সম্পদের বিশাল রাজস্ব। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে এবার কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আগামী শুক্রবার বা ৮ আগস্টের মধ্যে যদি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সম্মত না হয়, তাহলে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যরত যেকোনো দেশের ওপর সেকেন্ডারি শুল্ক আরোপ করা হবে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া এসব দেশের পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ কর বসানো হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, তবে বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। কারণ, রাশিয়া এখনও বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক। তাদের তেলের প্রধান ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত ও তুরস্ক।
বিশ্বজুড়ে মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা
জ্বালানির বাজারে রাশিয়ার প্রভাব অনেক বেশি। ফলে সেকেন্ডারি শুল্কের ফলে যদি সরবরাহ কমে যায়, তাহলে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এমনটাই হয়েছিল ২০২২ সালে, যখন রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালায়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকস-এর বিশ্লেষক কিয়েরান টম্পকিনস মনে করেন, নতুন শুল্কের ফলে সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি দামের ওপর। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওপেকের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা থাকায় কিছুটা ভারসাম্য আনা যেতে পারে।
ভারতে তৈরি আইফোনের দাম নিয়ে শঙ্কা
ট্রাম্পের পরিকল্পিত শুল্কের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে ভোক্তাপণ্যের বাজারে, বিশেষ করে মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে। অ্যাপল তাদের আইফোনের একটি বড় অংশ এখন ভারতে তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। যদি ভারতের ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপ হয়, তাহলে এসব পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যেতে পারে।
শুল্কের বোঝা সাধারণত ভোক্তাদের ওপরই পড়ে, ফলে আমেরিকান ক্রেতাদের জন্য ভারতে তৈরি ফোন কিনতে দ্বিগুণ দাম গুনতে হতে পারে। এমনকি আগে থেকেই ভারতের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে, যা আরও বাড়ানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প।
চীনের ক্ষেত্রে আরও জটিল বাস্তবতা
রাশিয়ার সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা চীন। ট্রাম্প যদি চীনের ওপরও একই ধরনের সেকেন্ডারি শুল্ক আরোপ করেন, তাহলে তা বাস্তবায়ন হবে অনেক বেশি জটিল। যুক্তরাষ্ট্রে চীন থেকে বিপুল পরিমাণে ভোক্তা পণ্য আমদানি হয় – খেলনা, পোশাক, ইলেকট্রনিকসসহ নানা কিছু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনকে রাশিয়া থেকে সরিয়ে আনা সহজ হবে না। কারণ, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে চীনের ওপর ট্রাম্পের একাধিক শুল্ক আরোপের পরেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়েছিল, কিন্তু লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
ইউরোপের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তুরস্ক এখনও রাশিয়ার বড় জ্বালানি গ্রাহক। যদিও ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইইউ রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে, তবুও কিছু আমদানি বহাল রয়েছে। এমন অবস্থায় নতুন সেকেন্ডারি শুল্ক ইউরোপের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যদি এই শুল্ক রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানিকারী ইইউ দেশগুলোর ওপরও প্রযোজ্য হয়, তাহলে ইউরোপীয় পণ্যের ওপর মার্কিন বাজারে প্রবেশে বড় বাধা আসবে।
রাশিয়ার অর্থনীতিতে সম্ভাব্য বিপর্যয়
যদিও রাশিয়া যুদ্ধকালেও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে, তবে নতুন নিষেধাজ্ঞা তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ৪.৩ শতাংশ থাকলেও চলতি বছর তা কমে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)।
রাশিয়ার অর্থনীতি অনেকটাই জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এই খাত থেকে সরকারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আয় আসে। কিন্তু সেকেন্ডারি শুল্কের কারণে যদি তেল-গ্যাস রপ্তানি কমে যায়, তবে তা রাশিয়াকে গভীর মন্দায় ঠেলে দিতে পারে।
ট্রাম্পের লক্ষ্য: যুদ্ধ বন্ধ ও অর্থনৈতিক চাপ
ট্রাম্পের এই বাণিজ্য নীতির মূল লক্ষ্য রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবাহ সীমিত করে ইউক্রেনকে সহায়তা করা। তার বিশ্বাস, এর ফলে ইউক্রেনে যুদ্ধ, ধ্বংস ও মানবিক দুর্ভোগের অবসান ঘটবে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনেক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শুল্ক যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রায়। পাশাপাশি এই উদ্যোগ বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সুত্রঃ বিবিসি