আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা পেয়েছে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা পেয়েছে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক। এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে অনুষ্ঠিত হয় ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সংলাপ। সেখানে দুই দেশ ‘‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’’ আরও দৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সের বরাতে জানা গেছে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠককালে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি সের্গেই শোইগু জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নয়াদিল্লি সফর করবেন। এই সফরকে ঘিরে ভারত ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ট্রাম্পের শুল্ক ও সংকটের শুরু
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৮ আগস্ট থেকে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হবে। ফলে এই শুল্কের হার দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচনের পর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। এতে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য—যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই চাপের বিরোধিতা করে বলা হয়েছে, ভারত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং তারা কার সঙ্গে বাণিজ্য করবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। মস্কো অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ‘অবৈধ বাণিজ্যিক চাপ’ সৃষ্টি করছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও যৌথ প্রতিরক্ষা
শোইগুর সঙ্গে বৈঠকে দোভাল বলেন, “বর্তমানে আমরা অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক স্থাপন করেছি। যে সম্পর্ককে আমরা অত্যন্ত মূল্য দিই এবং এটি একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব।”
জবাবে শোইগু বলেন, “আমরা একটি নতুন, অধিক ন্যায্য ও টেকসই বিশ্বব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আইনের শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করতে এবং আধুনিক হুমকি মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
রাশিয়ার ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ভারত ও চীন হয়ে উঠেছে রুশ অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ ক্রেতা। তবে সম্প্রতি মার্কিন হুমকি ও রুশ তেলের ছাড় কমে যাওয়ায় ভারতের রাষ্ট্রীয় পরিশোধনাগারগুলো রুশ তেল কেনা বন্ধ করেছে। তবে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও নায়ারা নামের দুটি বেসরকারি পরিশোধনাগার এখনো রাশিয়া থেকে তেল কিনছে।
দোভালের মস্কো সফরে রুশ তেল কেনা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন ভারতের সরকারি এক কর্মকর্তা।
প্রতিরক্ষা খাত ও এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা
২০১৮ সালে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করে, যার আওতায় তারা পাঁচটি এস-৪০০ দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার পরিকল্পনা করে। এই ব্যবস্থা ভারত মূলত চীনের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহার করতে চায়।
তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে একাধিকবার বিলম্ব হয়েছে। শেষ দুটি এস-৪০০ ব্যবস্থা ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হতে পারে বলে জানা গেছে। যদিও ঐতিহ্যগতভাবে ভারত অস্ত্র আমদানিতে রাশিয়ার ওপর নির্ভর করে আসছে, গত কয়েক বছরে ভারত পশ্চিমা দেশগুলোর দিকেও ঝুঁকছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতির ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভ্লাদিমির পুতিনের আসন্ন দিল্লি সফর দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বার্তা দিচ্ছে। একইসঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন ভারসাম্য গঠনের ইঙ্গিতও বহন করছে।
সুত্রঃ রয়টার্স