দিনে দুপুরে লুট করা হচ্ছে সিলেটের সাদা পাথর; ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৪ আগষ্ট- সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ সাদা পাথর এলাকায় চলমান লুটপাট বন্ধ ও লুট হওয়া পাথর আগের অবস্থানে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বুধবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় এ সংক্রান্ত ৫ দফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সিলেট ও বিভাগীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, জাফলং ইসিএ ও সাদা পাথর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা যৌথ বাহিনী টহল দেবে এবং গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের চেকপোস্টে যৌথ বাহিনীর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। অবৈধ ক্রাশিং মেশিনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও কার্যক্রম বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। পাথর চুরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি লুট হওয়া পাথর উদ্ধার করে আগের স্থানে পুনঃস্থাপন করা হবে।
গত ১ বছর থেকে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় সাদা পাথর ও সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালায়। জামায়াত, বিএনপি, এনসিপি, চরমোনাই পীর ফজলুল হকসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, ধর্মঘটসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। তারা অভিযোগ করে, ভারতের স্বার্থে বিগত সরকার কোয়ারি বন্ধ রেখেছে, এবং পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখায় সিলেটে ঘনঘন বন্যা হচ্ছে—এমন কুযুক্তিও ছড়ানো হয়। কিন্তু এই দাবির আড়ালে ‘পাথর খেকো’ চক্র প্রকাশ্যে ও গোপনে সাদা পাথরের বিপুল পরিমাণ পাথর লুট করে নেয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চার বছর পরিবেশকর্মী হিসেবে সিলেটে পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখতে পেরেছি, এখন উপদেষ্টা হয়েও পারলাম না।” পরিবেশবাদী সংগঠন ও সুশীল সমাজও বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।
প্রশাসনের তৎপরতার অংশ হিসেবে বুধবার সাদা পাথর এলাকায় যায় দুদকের ৯ সদস্যের তদন্তদল, যার নেতৃত্ব দেন দুদক সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক রাফী মোহাম্মদ নাজমূস সাদাত। তদন্ত শেষে দুদক জানায়, লুটপাটে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের দায় সবচেয়ে বেশি বলে মন্তব্য করে তারা। এছাড়া পর্যটন খাতের ক্ষতির সঙ্গে প্রশাসনের যোগসাজশ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা অভিযোগ করে আসছেন, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এই লুটপাট চলছে, যা শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং সিলেটের পর্যটন শিল্পকেও মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। এই নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সাদা পাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা রক্ষা পাবে—এমন আশা করছেন স্থানীয়রা।