সুদানের উত্তর আর পূর্বের অধিকাংশ অঞ্চল সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে । ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ২ নভেম্বর- আফ্রিকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দেশ সুদান এখন রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)–এর সংঘাত দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত দেড় লাখেরও বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এখন সুদানে ঘটছে।
গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে ২০১৯ সালে দীর্ঘদিনের শাসক ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে।
বিপুল জনবিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনী তাকে অপসারণ করে ক্ষমতায় আসে, তবে জনগণের দাবিতে গঠিত বেসামরিক-সামরিক যৌথ সরকারও স্থায়ী হয়নি।

প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। ছবিঃ বিবিসি
২০২১ সালের অক্টোবরে আরেকটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সে সরকারকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
এর পেছনে ছিলেন দুই সামরিক নেতা- জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান (সেনাবাহিনীর প্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট) এবং জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো (হেমেডটি), যিনি র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর প্রধান।
শুরুতে তারা মিত্র ছিলেন, কিন্তু ক্ষমতা ভাগাভাগি ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই একসময় সংঘাতে রূপ নেয়।
আরএসএফের এক লাখের বেশি সদস্যকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা-এই ইস্যু থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়।
এর জেরে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হয়।
সংঘাত শুরুর পর থেকেই দেশজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে।
আরএসএফ বাহিনী রাজধানী খার্তুম ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়।
অন্যদিকে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে রেখেছে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বড় অংশ।
মিশর সেনাবাহিনীকে সহায়তা করছে বলে ধারণা করা হয়।

দক্ষিণ গাজার কারেম আবু সালেম ক্রসিং থেকে ত্রাণ ট্রাক প্রবেশের পর ফিলিস্তিনি নারী ও একটি ছেলে খাদ্য সংগ্রহের জন্য সমাবেশের দিকে তাকিয়ে আছে। ছবি : এএফপি
যুদ্ধের কারণে রাজধানী খার্তুম প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
শহরটির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে বোমা হামলায়, হাসপাতাল, স্কুল, বাজার-সবই অচল।
এমনকি দারফুর ও কোর্দোফান অঞ্চলেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।
আরএসএফ বাহিনীর ইতিহাসও রক্তাক্ত।
২০১৩ সালে গঠিত এই বাহিনীর মূল উৎস জানজাওয়িদ মিলিশিয়া, যারা ২০০০-এর দশকে দারফুরে গণহত্যা চালানোর জন্য কুখ্যাত ছিল।
ওমর আল-বশির এই বাহিনীকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে আধাসামরিক রূপ দেন।
পরবর্তীতে জেনারেল দাগালো (হেমেডটি) এই বাহিনীর নেতৃত্বে এসে ক্ষমতা ও অর্থ দুই-ই অর্জন করেন।
আরএসএফ বাহিনী ইয়েমেন ও লিবিয়ার যুদ্ধেও অংশ নেয় এবং সুদানের সোনার খনি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সুদানে এখন গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ চলছে।
জাতিসংঘের তদন্তে উঠে এসেছে, আরএসএফ এবং সেনাবাহিনী উভয়ই মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, আরএসএফ বাহিনী নারী, শিশু ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাচ্ছে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, এমনকি এক বছর বয়সী শিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
দারফুরের অনেকেই বিশ্বাস করেন, আরএসএফ ওই অঞ্চলকে আরব অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে রূপ দিতে চায়।
এখন পরিস্থিতি এমন যে দেশটির বড় অংশে আইন, প্রশাসন ও সেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
চলছে দুর্ভিক্ষ, অনাহার, চিকিৎসা সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রায় ২ কোটি মানুষ খাদ্যঘাটতির মুখে, এবং ৪ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে ৮০ শতাংশ আয় কমে গেছে।
সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে থাকা পোর্ট সুদান শহর এখন জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের কেন্দ্র হলেও সেটিও নিরাপদ নয়; মার্চ মাসে সেখানে আরএসএফের ড্রোন হামলায় বহু প্রাণহানি ঘটে।
অন্যদিকে আরএসএফ এল-ফাশের শহর দখল করে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরএসএফ দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিকল্প সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে।
এতে আশঙ্কা বাড়ছে যে সুদান আবারও বিভক্ত হতে পারে-
যেমনটি ঘটেছিল ২০১১ সালে, যখন দেশটি ভেঙে দক্ষিণ সুদান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা বলছেন,
“যদি দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধান না আসে, তবে সুদান পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।”
গৃহযুদ্ধে ক্লান্ত মানুষ এখন বাঁচার আশায় দেশ ছাড়ছে।
সুদান আজ এক বিভক্ত, অনাহারগ্রস্ত ও রক্তাক্ত রাষ্ট্র –
যেখানে প্রতিদিন নতুন কবর খোঁড়া হচ্ছে, কিন্তু শান্তির কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না।
সুত্রঃ বিবিসি