হান্টিংডনগামী ট্রেনে তাণ্ডব: আতঙ্কে পালাচ্ছে যাত্রী, দুই হামলাকারী গ্রেপ্তার।”
মেলবোর্ন, ২ নভেম্বর: যুক্তরাজ্যে এক ভয়াবহ ট্রেন ছুরিকাঘাতের ঘটনায় অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে ইংল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলীয় কাউন্টি ক্যামব্রিজশায়ারে। ঘটনার সময় রাত ৭টা ৩৯ মিনিটে লন্ডন নর্থ ইস্টার্ন রেলওয়ে (LNER) ট্রেন থামিয়ে দেয়া হয়।
ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ জানিয়েছে, “ঘটনার দায়ে ইতিমধ্যেই দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
সশস্ত্র বাহিনীসহ ৩০ জনেরও বেশি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালায়। প্রাথমিকভাবে এটি সন্ত্রাসী হামলা (terror attack) বলে ধারণা করা হলেও পরবর্তীতে পুলিশ সেই ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেয়।
নয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মোট ১০ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে নয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এখন পর্যন্ত কোনও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনাটিকে “মেজর ইনসিডেন্ট” ঘোষণা করা হয়েছে এবং তদন্তে সহায়তা করছে কাউন্টার টেররিজম পুলিশ ইউনিট।
চোখে দেখা ভয়াবহতা: “রক্তে ভাসছিল চারপাশ”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ট্রেনে “রক্তে ভেসে যাচ্ছিল সবকিছু”, যাত্রীরা আতঙ্কে একে অপরকে পিষে ফেলছিল পালানোর সময়। এক যাত্রী ‘দ্য সান’-কে বলেন, “এক ব্যক্তি হাতে বড় ছুরি নিয়ে চারদিকে আঘাত করছিলেন, পুলিশ তাকে টেসার গানে অচেতন করে।”
আরেকজন বলেন, “পুরো দৃশ্যটা যেন সিনেমার মতো, ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খলা চারদিকে রক্ত, চিৎকার, আতঙ্ক। মনে হচ্ছিল সবকিছু অবাস্তব।”
এক প্রত্যক্ষদর্শী স্কাই নিউজকে বলেন, “প্রথমে ৪–৬ জন আহত হয়েছে মনে হচ্ছিল, কিন্তু পরে দেখা যায় হামলাকারীরা ফিরে এসে আরও অনেককে আক্রমণ করে।”
সন্ত্রাস ঘোষণা প্রত্যাহার
প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ঘটনাটিকে ‘প্লাটো’ (Plato) কোডনেমে “মারাউডিং টেরর অ্যাটাক” হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
পরে তদন্তের অগ্রগতির পর বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান জানায়, সেই ঘোষণা বাতিল করে এটিকে সাধারণ “মেজর ইনসিডেন্ট” হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “নয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, একজনের আঘাত তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর। এখন পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর নেই।”
ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশের চিফ সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস কেইসি বলেন, “এটি একটি ভয়াবহ ঘটনা। ভুক্তভোগী পরিবারগুলির প্রতি আমরা গভীর সহানুভূতি জানাচ্ছি। তদন্ত চলছে, এবং কারণ নির্ধারণে কিছুটা সময় লাগবে।”
যাত্রীরা বললেন: ‘আমরা ভেবেছিলাম হ্যালোউইনের প্র্যাঙ্ক’
প্রত্যক্ষদর্শী অলি ফস্টার বিবিসিকে বলেন, “প্রথমে কেউ চিৎকার করে বলছিল‘দৌড়াও, দৌড়াও, একজন সবাইকে ছুরিকাঘাত করছে।’ আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো হ্যালোউইনের ঠাট্টা।”
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দেখেন, তাঁর হাত রক্তে ভেজা তিনি যেই আসনে হেলান দিয়েছিলেন, সেটিও রক্তে ঢেকে গেছে। তিনি আরও বলেন, “একজন বয়স্ক যাত্রী এক তরুণীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন, নিজে গুরুতর আহত হন মাথা ও ঘাড়ে আঘাত লাগে।”

জরুরি সেবার তৎপরতা: কয়েক মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় সশস্ত্র পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রীর নিন্দা ও সহানুভূতি
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘটনাটিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও জঘন্য অপরাধ” বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, “এই ভয়াবহ ঘটনার শিকার সকলের প্রতি আমার সমবেদনা রইল। জরুরি সেবাদানকারী সকল সংস্থাকে ধন্যবাদ জানাই।”
ইস্ট অব ইংল্যান্ড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, “বহু আহত যাত্রীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স, কমান্ড টিম ও বিপজ্জনক এলাকা উদ্ধার ইউনিট কাজ করছে।”
ট্রেন চলাচল বন্ধ, জনসাধারণকে সতর্কতা
লন্ডন নর্থ ইস্টার্ন রেলওয়ে (LNER) জানিয়েছে, হান্টিংডন স্টেশনে জরুরি সেবাকর্মীরা কাজ শেষ না করা পর্যন্ত সমস্ত রেললাইন বন্ধ থাকবে।
যাত্রীদের ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি “বড় ধরনের বিঘ্ন (major disruption)”-এর সতর্কতা জারি করেছে। হান্টিংডনের এমপি বেন ওবেস-জেকটি বলেন, “এত দ্রুত ও কার্যকর জরুরি প্রতিক্রিয়া আমি আগে কখনও দেখিনি।”
ক্যামব্রিজশায়ার ও পিটারবোরোর মেয়র পল ব্রিস্টো এক্স-এ (পূর্বে টুইটার) লিখেছেন, “হান্টিংডন ট্রেনে ভয়াবহ দৃশ্যের খবর শুনে গভীরভাবে শোকাহত। আমার প্রার্থনা রইল সব আক্রান্ত মানুষের জন্য।”