সর্বশেষ

স্কুলে ভর্তি ফি নৈরাজ্যে নিষ্পেষিত অভিভাবক, নির্বিকার সরকার

  • 3:44 pm - January 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১০৮ বার

মেলবোর্ন ১১ জানুয়ারি- চলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত নীতিমালা কার্যত উপেক্ষিত। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্কুলে স্কুলে ভর্তি ফি নিয়ে চলছে চরম নৈরাজ্য। নীতিমালায় নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি থাকলেও বাস্তবে সেই অঙ্কে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চাপে অভিভাবকরা নাভিশ্বাস ফেলছেন, আর সরকারের নীতিমালা রয়ে গেছে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

চলতি শিক্ষাবর্ষে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ভর্তি ফি পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ আট হাজার এবং ইংরেজি ভার্সনে ভর্তি ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। উন্নয়ন খাতে কোনো প্রতিষ্ঠান তিন হাজার টাকার বেশি আদায় করতে পারবে না। একই প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে সেশন ফি সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুনঃভর্তি ফি নেওয়ার সুযোগও নেই। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

রাজধানীর অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নীতিমালা মানা হচ্ছে না। কোনো কোনো স্কুল কৌশলে ভর্তি ফি সরকার নির্ধারিত অঙ্কে রাখলেও এর সঙ্গে উন্নয়ন ফি, সেশন ফি, অগ্রিম বেতনসহ নানা খাত যুক্ত করে মোট অঙ্ক কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ভর্তির সময় মার্চ মাস পর্যন্ত অগ্রিম বেতন আদায় করছে। সব মিলিয়ে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা দিতে গিয়ে চরম চাপে পড়ছেন অভিভাবকরা।

শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রতিবছরই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ উঠলেও তা ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। রাজধানীতে ভর্তি ফির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে আলোচনায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে লিটল জুয়েলস স্কুল, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সাউথপয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

২০২৬ শিক্ষাবর্ষে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন শুরু হয় গত ২১ নভেম্বর এবং শেষ হয় ৭ ডিসেম্বর। এরপর ১৪ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন সম্পন্ন হয়। নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, সেশন চার্জসহ ভর্তি ফি মফস্বল এলাকায় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা, পৌর উপজেলায় এক হাজার, পৌর জেলা সদরে দুই হাজার এবং ঢাকা ছাড়া অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় তিন হাজার টাকার বেশি হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, দেশের বেশির ভাগ স্কুলই এই নির্দেশনা মানেনি।

অধিকাংশ বেসরকারি স্কুলে ভর্তি কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা নীতিমালা উপেক্ষা করেই অতিরিক্ত ফি আদায় করে শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, অতিরিক্ত ভর্তি ফির কারণে অভিভাবকরা চরমভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছেন। অথচ বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।

অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রতিবছর ভর্তি ফি বাড়লেও সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। মিলাদ মাহফিল, ইউটিলিটি, বিদ্যুৎ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানসহ গুরুত্বহীন খাত দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা আদায় করা হচ্ছে। নীতিমালায় এবারও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ ও অবসর তহবিলের জন্য শিক্ষার্থীপ্রতি ১০০ টাকা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

রাজধানীর পুরানা পল্টনের লিটল জুয়েলস স্কুলে নার্সারিতে ভর্তি নিতে ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা, যা নীতিমালার তুলনায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা বেশি। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করতে ১০ হাজার এবং প্রথম শ্রেণিতে ১১ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে বাংলা মাধ্যমে ভর্তি ফি ১০ হাজার এবং ইংরেজি মাধ্যমে ১২ হাজার টাকা। এর বাইরে বই-খাতা বাবদ আরও তিন হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।

এক অভিভাবক জানান, ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করাতে এক মাসের বেতনসহ আট হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। হলিক্রস স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করতে আট হাজার ৩০০ টাকা নেওয়া হয়েছে, যার একটি বড় অংশ অগ্রিম বেতন। তেজগাঁওয়ের বিজি প্রেস উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি ফি নেওয়া হচ্ছে তিন হাজার ৮০০ টাকা, যেখানে মাসিক বেতন ৫০০ টাকা।

অভিযোগ উঠেছে, মোহাম্মদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি ও বিনামূল্যের বই বিতরণের সময় শিক্ষার্থীপ্রতি ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানা শিক্ষা কর্মকর্তা নাইয়ার সুলতানা বলেন, এ ধরনের অর্থ আদায় অনৈতিক ও অনিয়ম। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলা মাধ্যমে ভর্তি ফি আট হাজার এবং ইংরেজি মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী থাকা এই প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ভর্তি ফি থেকেই এ বছর ন্যূনতম আয় হয়েছে প্রায় ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লায়লা আক্তার বলেন, তারা সরকার নির্ধারিত ফিই আদায় করছেন এবং তাদের একমাত্র আয়ের উৎস ভর্তি ও টিউশন ফি।

শুধু ভর্তি ফি নয়, টিউশন ফি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সরকারের নির্ধারিত নীতিমালায় ঢাকায় বেসরকারি স্কুলে মাসিক বেতন ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি আদায় করছে।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, নীতিমালা থাকলেও তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে ভর্তি ও টিউশন ফি নিয়ে এই নৈরাজ্য থামছে না। কার্যকর নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে অভিভাবকদের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই শাখার আরও খবর

এআইচালিত সাইবার হামলায় অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সেবা অচল হওয়ার আশঙ্কা

ওটিএন বাংলা: সংস্থাটির ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক সাইবার হুমকি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি সাইবার নিরাপত্তার পরিবেশ বদলে দিচ্ছে। রাষ্ট্রসমর্থিত হ্যাকার ও…

ফ্রান্স ও জার্মানিতে বিক্ষোভে সংঘর্ষ, প্যারিসে পেট্রলবোমায় পুলিশ সদস্য দগ্ধ

ওটিএন বাংলা: জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বৈষম্য এবং শিক্ষা ও জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্স ও জার্মানিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। স্থানীয় সময় শনিবার কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে…

ধানক্ষেতের পাশের গর্তে নারী-পুরুষের অর্ধগলিত লাশ

যশোরের কেশবপুর উপজেলায় ধানক্ষেতের পাশের একটি শ্যালো মেশিন ঘরের গর্ত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী ও এক পুরুষের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে উপজেলার…

আতঙ্কে রাতে আত্মীয়দের বাড়িতে থাকছেন মানিক পশারীর মেয়ে ও বোন

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সরাসরি কারও কাছ থেকে হুমকি না পেলেও…

আবারও কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন ঘেরাও

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আবারও কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন ঘেরাওয়ের চেষ্টা করেছে একটি সংগঠন। শনিবার ‘বঙ্গসেনা’ নামের সংগঠনটির উদ্যোগে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল থেকে…

এইচএসসিতে প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী ফেল, ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার কেন?

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au