বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। ছবিঃ সংগৃহীত
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ও রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদানে বাধা দেওয়ার ঘটনায় নিন্দা, ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছেন দেশের ২৮ বিশিষ্ট নাগরিক। তাঁরা বলেছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া কোনো ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা নির্ধারণের একমাত্র ক্ষমতা রাষ্ট্রের। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে না।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকেরা এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে তাঁরা উল্লেখ করেন, গত ২৪ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর গার্ড অব অনার ও দাফনকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়। ঘটনাটি জনমনে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে বলেও তাঁরা মনে করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা সেটি ভরাট করে দেন। পরে রাত আনুমানিক ২টার পর মানিক পশারীর মেয়ে ও তাঁর দুই বোন গ্রাম পুলিশের সহায়তায় মোবাইল ফোনের আলোয় আবার কবর খোঁড়েন। মৃত্যুর প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
বিশিষ্ট নাগরিকেরা বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষবিদায়কে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

হুমকির অভিযোগে এলাকা ছাড়লেন মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর বোন।ছবি: সংগৃহীত
বিবৃতিতে মানিক পশারীর পরিচয় ও মৃত্যুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়, তিনি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই গত ২৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়ে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাফনে বাধা দেওয়া হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিদাতারা বলেন, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর দাফন মৌলিক মানবাধিকার। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, এমনকি রাষ্ট্রও এ অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না। পরবর্তী সময়ে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে তাঁর মরদেহ নিয়ে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় জামায়াত নেতা-কর্মীদের বাধার কারণে প্রায় ১৫ ঘণ্টা তাঁর দাফন আটকে ছিল।
তাঁরা আরও বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া কোনো ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে স্বীকৃতি যাচাই-বাছাই করতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী কোনো দল বা সংগঠন নিজেরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে না।
বিবৃতিতে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, দলটি সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। দলটির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, দলটি এখন পর্যন্ত ওই ভূমিকার দায় স্বীকার করেনি কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করেনি।
মানিক পশারীর সঙ্গে সংঘটিত ঘটনাকে ফৌজদারি অপরাধের শামিল বলে মনে করেন বিবৃতিদাতারা। তাঁরা বলেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা অতীত ভূমিকার কারণে তাঁর জানাজা ও দাফনে বাধা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মৃত ব্যক্তির যথাযথ মর্যাদায় সৎকার করা ইসলামসহ সব ধর্মেরই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সেই শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে মানিক পশারীর প্রতি যে অসম্মান দেখানো হয়েছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা তাঁদের নেই বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উপযুক্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ২৮ বিশিষ্ট নাগরিক।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধূরী, খুশী কবির, জেড আই খান পান্না, ইফতেখারুজ্জামান, শাহীন আনাম, রেহনুমা আহমেদ, শহিদুল আলম, স্বপন আদনান, শামসুল হুদা, তবারক হোসেন, সামিনা লুৎফা, সুমাইয়া খায়ের, তানজীমউদ্দিন খান, রোবায়েত ফেরদৌস, জোবাইদা নাসরীন, নোভা আহমেদ, জাকির হোসেন, সুব্রত চৌধুরী, সালমা আলী, মো. নুর খান, পাভেল পার্থ, রোজিনা বেগম, সাইদুর রহমান, সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, হানা শামস আহমেদ ও মুক্তাশ্রী চাকমা।