বাংলাদেশ

বিশ্ববাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না

  • 5:37 am - January 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৭২ বার
মূল্যস্ফীতির প্রতীকী ছবি

মেলবোর্ন, ২১ জানুয়ারি- কোনো উদ্যোগেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং উল্টো বেড়েছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমা, জ্বালানি তেলের দরপতন, ডলার সংকট অনেকটাই কেটে যাওয়া, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য আবার উদ্বৃত্তে ফেরা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার মতো ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক থাকার পরও দেশের বাজারে স্বস্তি আসেনি। বরং নিত্যপণ্যের দাম বাড়তেই থাকছে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কমছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শে যে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি চালু আছে, তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হয়নি। এর মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি অর্থনীতি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকারি ব্যয়, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের খরচ, বাজারে বাড়তি নগদ টাকার প্রবাহ এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে তারল্য বাড়লেও এর বড় অংশ যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংস্কার ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রবাসীরাও পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে অর্থ পাঠাচ্ছেন, যার একটি অংশ রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আসছে। ফলে বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বাড়লেও তা উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে মূলত ভোগব্যয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে।

বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে তার সুফল মিলছে না। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, দুধের গুঁড়া ও জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২০ ডলার কমেছে, চালের দাম টনপ্রতি কমেছে ৬০ ডলারের বেশি। পাম অয়েল, সয়াবিন তেল ও গমের দামও কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এসব পণ্যের খুচরা দাম কমেনি, অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। আমদানি মূল্য ও বাজারমূল্যের ব্যবধান বাড়তে থাকায় প্রশ্ন উঠছে বাজার তদারকি ও প্রতিযোগিতা নিয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যই এর মূল কারণ। কৃষক পর্যায়ে দাম কমলেও ভোক্তা পর্যায়ে তার সুফল না পৌঁছানো সরবরাহ ব্যবস্থার বড় দুর্বলতার দিকটি তুলে ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদহার বাড়িয়ে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নেওয়া হলেও মূল্যস্ফীতি কমেনি। বরং উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ কমেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি মূলত চাহিদাজনিত নয়, বরং সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যার ফল। তাই শুধু সুদহার বাড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা যাচ্ছে না।

নির্বাচনকে ঘিরে বাড়তি ব্যয়ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। চলতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রার্থীদের প্রচার ব্যয়, ডিজিটাল প্রচারণা, পোস্টার-ব্যানার ও শোডাউনের খরচ। এতে একদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সাময়িক কর্মসংস্থান হলেও অন্যদিকে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে পণ্যের চাহিদা ও দাম বাড়ছে।

নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশই আসে কালোটাকা থেকে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জিডিপির বড় একটি অংশই কালোটাকার আওতায়। নির্বাচনকালে এই অর্থ বাজারে সক্রিয় হয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ায়।

রেমিট্যান্স প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ১৯ দিনেই দেশে এসেছে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ডলার কিনে বিপুল পরিমাণ টাকা বাজারে ছেড়েছে। এতে ব্যাংক ও গ্রাহকদের নগদ টাকার চাহিদা বেড়েছে এবং বাজারে অর্থের সরবরাহ আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল উচ্চ পর্যায়ে। বছরজুড়ে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, রমজান ও ঈদের অতিরিক্ত চাহিদায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী যেখানে মূল্যস্ফীতি কমছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছে। আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অথচ বাংলাদেশে তা প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশে আটকে আছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ব্যবধান দেখায় যে বাংলাদেশের সমস্যা মূলত বাজার কাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি চালিয়েও যখন কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না, তখন স্পষ্ট হচ্ছে যে শুধু সুদহার বাড়ানো দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর হস্তক্ষেপ, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

এই শাখার আরও খবর

তাহসিফের বান্ধবী দিশা গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে, কে এই রহস্যময়ী তরুণী?

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট :  বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। এবার আলোচনায় এসেছেন ১৯…

গোল্ড কোস্টে সংগীত উৎসবে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড ধস, হাসপাতালে চারজন

অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে একটি সংগীত উৎসবে শত শত দর্শকের বসার জন্য তৈরি গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড ধসে অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থলে…

পার্থে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় দুই কিশোরের মৃত্যু, হাসপাতালে আরও দুজন

অস্ট্রেলিয়ার পার্থের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছে আরও দুই কিশোর। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা…

আপত্তিকর ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ, জামায়াত নেতার বাড়িঘর ভাঙচুর

মাদারীপুরের শিবচরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার জেরে তাইজুল ইসলাম নামের এক জামায়াত নেতার বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। রোববার (১ নভেম্বর) সকালে…

আদালত অবমাননার অভিযোগে ৪ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে হবে ব্যারিস্টার ফুয়াদকে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগসংবলিত মন্তব্যের জেরে আদালত অবমাননার অভিযোগে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে তলব করেছেন ট্রাইব্যুনাল।…

এপিএল ড্রাফটে প্লাটিনাম ও ডায়মন্ড ক্যাটাগরিতে ১০ বাংলাদেশি

আফগানিস্তান প্রিমিয়ার লিগের (এপিএল) আসন্ন ড্রাফটে জায়গা পেয়েছেন বাংলাদেশের ১০ ক্রিকেটার। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন রয়েছেন প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে এবং বাকি পাঁচজন ডায়মন্ড ক্যাটাগরিতে। আগামী ৩ নভেম্বর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au