বাংলাদেশ

বাংলাদেশের পাট-শিল্পের ভবিষ্যৎ কি?

  • 8:26 pm - November 01, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৮ বার
“বাংলাদেশের পাটকলগুলো পুনরায় চালু করা গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেগুলোতে উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং শিল্পকে টেকসই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়াই হবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।” ছবি: সংগৃহীত

২০২০ সালে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন ২৫টি পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেগুলো আবার উৎপাদনে ফেরাতে কয়েক মাস আগে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব কারখানা চালুর লক্ষ্যে নেওয়া এ কর্মসূচির আওতায় গত অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত ১৭টি পাটকলের ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি কারখানায় উৎপাদনও শুরু হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষের। কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে সরকার। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এসব কারখানায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কতটা দীর্ঘস্থায়ী করা যায়, সেটিই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় অনেক পাটকলের যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়েই উৎপাদন শুরু করলেই বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। বিনিয়োগকারীদের উচিত কারখানাগুলোর কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করা। পাশাপাশি জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। ইজারা চুক্তিতে বিনিয়োগের সময়সীমা, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। নিয়মিত কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং অনিয়ম বা ব্যর্থতার ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

পাটকলগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ হওয়ায় ইজারা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইজারা দেওয়ার অর্থ এসব কারখানার মালিকানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া নয়; বরং নির্দিষ্ট শর্তে সেগুলোর উৎপাদন ও পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দেওয়া। তাই ইজারা চুক্তি, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং পরিচালনাগত কার্যক্রমের ওপর সরকারের কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। পাশাপাশি কোন কারখানায় কত বিনিয়োগ হচ্ছে, কী পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে, কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং চুক্তির শর্ত কতটা মানা হচ্ছে, সে বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা উচিত। এতে শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

পাটশিল্পের পুনর্জাগরণে নতুন বাজার সৃষ্টি ও পণ্যের বহুমুখীকরণেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশবান্ধব উপকরণের প্রতি বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ায় প্রচলিত পাটের বস্তা, সুতা ও চটের বাইরে নতুন পণ্যের বাজার তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাটের ব্যাগ, জিওটেক্সটাইল, আসবাব, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বস্ত্র এবং প্রাকৃতিক তন্তুর সমন্বয়ে তৈরি কম্পোজিট পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে শুধু পরিবেশবান্ধব পণ্য হলেই বাজারে সফলতা আসবে না। প্রতিযোগিতামূলক দাম, মানের ধারাবাহিকতা, আন্তর্জাতিক সনদ, আধুনিক নকশা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় উৎপাদন পরিকল্পনা সাজানো প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। উন্নত তন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং পাটের বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্প্রসারণে যৌথ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষণাকে শুধু তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিল্পকারখানার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে গবেষণার সংযোগ তৈরি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, পণ্যের মান পরীক্ষা এবং উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে রূপ দেওয়ার ওপর জোর দিতে হবে।

পাটশিল্পের টেকসই বিকাশে কৃষকদের স্বার্থও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারখানার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত কাঁচা পাটের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, অন্যদিকে কৃষকদের প্রয়োজন ন্যায্য দাম ও নিশ্চিত বাজার। এ দুইয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়বে। পাটের মান অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং উৎপাদনকারী অঞ্চল ও কারখানার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো গেলে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম পাবেন, তেমনি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহে সুবিধা পাবে। মনে রাখতে হবে, কাঁচামাল উৎপাদনকারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও পাটকল পুনরুজ্জীবনের অপরিহার্য শর্ত। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন পরিশোধ, সামাজিক সুরক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অভিজ্ঞ শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অর্জিত কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই সম্ভব হলে তাঁদের কাজে ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্পের পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য শুধু কারখানার চাকা সচল করা নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনমানের উন্নয়নও নিশ্চিত করা।

বিজেএমসির অবশিষ্ট সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সরকারকে বাস্তবতাভিত্তিক পৃথক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সব পাটকল একই ব্যবসায়িক মডেলে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। প্রতিটি কারখানার অবকাঠামোগত অবস্থা, অবস্থান, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, বাজারের সম্ভাবনা এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো কোনো কারখানায় বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন লাভজনক হতে পারে, আবার কোনো কোনো স্থাপনা জাতীয় শিল্পনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকল্প উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আইনি জটিলতা ও বিরোধের কারণে মূল্যবান শিল্পসম্পদ বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকলে সেসব সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

পাটকলগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত পরিবীক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর আওতায় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে প্রকৃত বিনিয়োগ, উৎপাদনের পরিমাণ, উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার, বিক্রয়, রপ্তানি, কর্মসংস্থান, মজুরি পরিশোধ এবং পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যায়ন করলে সমস্যাগুলো শুরুতেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে যেসব কারখানা সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন কৌশল অন্য কারখানায় প্রয়োগ করা যাবে। তবে নজরদারির পাশাপাশি প্রযুক্তি গ্রহণ, বাজার সম্প্রসারণ ও উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তাও দিতে হবে।

বাংলাদেশের বন্ধ পাটকলগুলো আবার চালু করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সেগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। এ জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার দিতে হবে এবং কৃষকদের উৎপাদিত পাটের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, স্বচ্ছ সরকারি তদারকি এবং বাজারভিত্তিক উৎপাদনের সমন্বয় ঘটানো গেলে বাংলাদেশের পাটশিল্প আবারও দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন বোর্ড গঠন

তৈরি পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং একজন নিরপেক্ষ সদস্য নিয়ে গঠিত এ বোর্ডের…

মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে ১১ আ.লীগ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, নাশকতার অভিযোগ ডিবির

ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর ও আশপাশের এলাকায় তৈরি পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের…

গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে ঝুট গুদামে আগুন

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড পোশাক কারখানার ঝুট গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার (১ নভেম্বর) দুপুরে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় এ আগুন…

‘আর মাত্র ৫ বছর বাঁচব’, কী হয়েছে তানিয়া বৃষ্টির?

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : ‘আর মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর বাঁচব’—চিকিৎসকের মুখে এমন কথা শুনতে হয়েছিল ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টিকে। ব্রেন টিউমার…

তিন স্টেশন স্থগিত করে চলছে মেট্রোরেল

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর নিরাপত্তার কারণে তিনটি স্টেশনে না থেমে চলাচল করছে মেট্রোরেল। রবিবার (১ নভেম্বর) দুপুর থেকে পল্লবী, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১০…

মিরপুরে ১১ নম্বরে পুলিশের গাড়িতে আগুন

রাজধানীর মিরপুরের ১১ নম্বর এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রবিবার (১ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার সময়…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au