বাংলাদেশ

৫টির উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ

২৭ দিনে ১০ বার ভূমিকম্প, বাড়ছে ঝুঁকি

  • 5:26 pm - February 28, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩৬ বার
ভূমিকম্পে সাতক্ষীরায় ফাটল ধরেছে পাকা দালানে (বাঁয়ে); পাশাপাশি ধসে গেছে কাঁচাঘর। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সদর ও শ্যামনগর উপজেলা থেকে তোলা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৮ ফেব্রুয়ারি- চলতি ফেব্রুয়ারির ২৭ দিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটির উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশে। অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি হলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার কাঁপনে মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি মাত্রার ঘন ঘন ভূকম্পন বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিতও হতে পারে।

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর–এর ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র জানায়, উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এবং ঢাকার আগারগাঁও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে দূরত্ব প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার।

অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবীর এটিকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে United States Geological Survey (ইউএসজিএস) উৎপত্তিস্থলে কম্পনের মাত্রা ৫ দশমিক ৩ নিশ্চিত করেছে।

ঝাঁকুনি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর ও ঝিনাইদহ জেলায়। জুমার নামাজের সময় হওয়ায় অনেক মানুষ মসজিদে ছিলেন। হঠাৎ কম্পনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দ্রুত ভবন ছেড়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নে একটি মন্দির ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান। শ্যামনগরের কয়েকটি এলাকায় মাটির ঘর ধসে পড়েছে। দৌড়াদৌড়ির সময় অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা গেছে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার বলেন, আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে কিছু এলাকায় বাড়িঘর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিক ক্ষতি হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়নি।

যশোর শহরের জজকোর্ট মসজিদে নামাজরত মুসল্লিরা জানান, নামাজের মধ্যে হঠাৎ পুরো ভবন দুলে ওঠে। খুলনা ও ঝিনাইদহেও একই ধরনের কম্পন অনুভূত হয়। বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ না হলেও ছোটখাটো ফাটলের খবর পাওয়া গেছে।

রাজধানী ঢাকায় কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী কম্পনে বহুতল ভবনের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে নিচে নেমে আসেন। এ ভূমিকম্পের প্রভাব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতাসহ আশপাশের এলাকাতেও অনুভূত হয়েছে।

চলতি মাসের শুরু থেকেই দেশে ও আশপাশের অঞ্চলে একাধিক ভূমিকম্প হয়েছে। ৩ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার অঞ্চলে উৎপত্তি হওয়া ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প বাংলাদেশে অনুভূত হয়। ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেট অঞ্চলে দুটি কম্পন রেকর্ড করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে ৫ দশমিক ১ মাত্রার কম্পন এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিকিম অঞ্চলে ৪ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়।

সব মিলিয়ে ২৭ দিনে ১০ বার ভূকম্পনের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যার পাঁচটির উৎপত্তিস্থল দেশের অভ্যন্তরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন ঘন ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প কখনো কখনো ভূত্বকের নিচে শক্তি সঞ্চয়ের ইঙ্গিত দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ছোট ছোট কম্পন বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। এ অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। সাতক্ষীরা সেই সক্রিয় অঞ্চলের কাছাকাছি। অতীতেও বড় ভূমিকম্পের আগে ছোট কম্পনের নজির আছে। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি মাথায় রেখে প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।

ভূতত্ত্ববিদদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিচে অন্তত ১৩টি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট-আসাম অঞ্চলের ডাউকি ফল্ট এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের সাবডাকশন জোন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জ এলাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের ইতিহাসও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নির্মাণব্যবস্থা ও অতিঘন জনবসতির কারণে ঢাকা বড় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। সে জন্য প্রয়োজন ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণ, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মূল্যায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

ঘন ঘন কম্পন আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও এগুলো বড় বিপদের আগাম সংকেত কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বার্তা স্পষ্ট—এখনই প্রস্তুতি না নিলে ভবিষ্যতে মূল্য দিতে হতে পারে অনেক বেশি।

এই শাখার আরও খবর

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

বিএনপি নেতাদের অভিনন্দন জানালেন ৩ উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তত তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au