বাংলাদেশ

মহান মে দিবস

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ঐতিহাসিক দিন আজ

  • 1:02 pm - May 01, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩৯ বার
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ঐতিহাসিক দিন আজ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১ মে- আজ মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে দিনটি পালিত হচ্ছে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে। ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেট চত্বরে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে নেমে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের সেই আত্মত্যাগই পরবর্তীতে শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে দেয় এবং বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে নতুন দিক নির্দেশনা দেয়। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে প্রতি বছর ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে এ বছরও দিনটি পালন করা হচ্ছে নানা আয়োজনে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’, যা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতার গুরুত্বকে তুলে ধরে।

দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন এবং সামাজিক সংগঠনগুলো র্যালি, সমাবেশ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন, শ্রমিক দল, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি ও অন্যান্য সংগঠন দিনটি ঘিরে পৃথক কর্মসূচি পালন করছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও শ্রমিকদের সম্মান জানিয়ে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।

মে দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শ্রমিকদের দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, শিল্প, কৃষি, নির্মাণসহ প্রতিটি খাতে শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রম দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। তাদের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তার বাণীতে শ্রমজীবী মানুষের অবদানকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। শ্রমবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শ্রমজীবী মানুষের অবদান অপরিসীম। কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন ও সেবা খাত—সব ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো শ্রমিকের শ্রমে গড়ে উঠেছে দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ। তাদের অবদানে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার।

তবে শ্রমিকদের এই অবদানের তুলনায় তাদের প্রাপ্য অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ কতটা নিশ্চিত হয়েছে, সেই প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক। দেশে শ্রমিকদের সুরক্ষায় ২০০৬ সালের শ্রম আইনসহ বিভিন্ন নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনও আইনি সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছেন।

মে দিবসকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি নতুন করে আলোচনায় আসে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, কর্মস্থলে নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের স্বাধীনতা—এসব দাবি এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরি পোশাক খাতে কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও নির্মাণ, পরিবহন ও গৃহকর্মীসহ অন্যান্য খাতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত।

এদিকে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনের কারণে শ্রমবাজারেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অটোমেশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে অনেক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন, আবার নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। ফলে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকার শ্রমিক কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এসব উদ্যোগ শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হলেও কার্যকারিতা বাড়াতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাও মে দিবসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখনও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ একটি দেশের অগ্রগতি নির্ভর করে তার শ্রমশক্তির ওপর। তাই শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমিকদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্বায়নের এই যুগে শ্রমিক অধিকার এখন শুধু জাতীয় ইস্যু নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে শ্রমনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রতিটি দেশের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর শিল্পখাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বাংলাদেশও এসব চ্যালেঞ্জের বাইরে নয়। তাই এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এখন আরও জরুরি।

মে দিবস শুধু অতীতের সংগ্রামের স্মারক নয়, এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও দেয়। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই এই দিনের মূল বার্তা। মহান মে দিবসে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রত্যাশা, রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে।

এই শাখার আরও খবর

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতায় বিএনপি, শেখ হাসিনাকে কি গৃহবন্দী করা হবে?

বাংলাদেশের নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া ‘খারাপ কোনো ধারণা নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে…

মোদির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলার মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার…

দিল্লিতে ভবন ধসে অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ নিহত ৩

ভারতের রাজধানী দিল্লির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমাপুরি এলাকায় একটি ভবন ধসে অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত ১১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা…

জ্বালানি সংকটে বন্ধ ৩৫ বিদ্যুৎকেন্দ্র, সর্বোচ্চ আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং

দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে ফের বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দিনে ও রাতে সর্বোচ্চ প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একই সময়ে দেশের ৩৫টি…

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ‘আইনি বিষয়’: রণধীর জয়সওয়াল

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান আবারও স্পষ্ট করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি মূলত একটি…

ভিক্টোরিয়ায় হিন্দু ইকোনমিক ফোরামের নতুন নেতৃত্ব

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদার করতে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে হিন্দু ইকোনমিক ফোরাম অস্ট্রেলিয়া। সংগঠনটির ভিক্টোরিয়া শাখার নতুন সভাপতি…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au