চাকরির আশায় কম্বোডিয়া, ১৭ দিন ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ বন্দী
কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির চাকরির আশায় দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন মো. শফিকুল ইসলাম। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে একটি…
মেলবোর্ন, ৯ মে- রাশিয়া কীভাবে বৈশ্বিক পারমাণবিক শক্তির বাজারে আধিপত্য গড়ে তুলেছে এবং এর মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এবিসি নিউজ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, দুর্বল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাশিয়া ধীরে ধীরে পারমাণবিক শক্তি রপ্তানির অন্যতম শীর্ষ শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব দেশ রাশিয়ার প্রযুক্তিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে, তারা শুধু নির্মাণ পর্যায়েই নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহ, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও দীর্ঘ সময় রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কয়েক দশক বা প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যখন তার দুর্বল হয়ে পড়া পারমাণবিক শিল্প পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে, তখন রাশিয়া এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন চুক্তি করছে। একই সময়ে বিশ্বের বহু দেশে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটমের প্রকল্প বিস্তৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশে রূপপুর প্রকল্প: রাশিয়ার প্রভাবের বড় উদাহরণ
বাংলাদেশের পদ্মা নদীর তীরে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় সম্পন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চললেও দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক জটিলতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং বিভিন্ন বাধার কারণে এটি আটকে ছিল।
এখন সেখানে ধাপে ধাপে জ্বালানি লোড করা শুরু হয়েছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পদ্মা নদীর তীরে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবিঃ সংগৃহীত
স্থানীয় এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক একটি গণমাধ্যমকে বলেন, শৈশবে তারা শুধু খালি জমি দেখতেন, যেখানে পরবর্তীতে একটি বিশাল পারমাণবিক প্রকল্প গড়ে উঠবে তা তখন কল্পনাও করা যায়নি।
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান রোসাটমের প্রধান আলেক্সেই লিখাচেভ বলেন, এটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের একটি মাধ্যম।
রাশিয়ার পারমাণবিক “সুপারপাওয়ার” হয়ে ওঠা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোভিয়েত যুগের পতন এবং চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর রাশিয়া ধীরে ধীরে বৈশ্বিক পারমাণবিক শক্তির অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে রাশিয়া চীন, ভারত, মিশর, বাংলাদেশ, তুরস্ক, হাঙ্গেরি ও কাজাখস্তানসহ একাধিক দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। পাশাপাশি মরক্কো থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত বহু দেশে কৌশলগত চুক্তি করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটম পুরো বাজারে আধিপত্য করছে কারণ এটি রাষ্ট্রীয় শক্তিশালী সহায়তা পায় এবং উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো চেইন নিয়ন্ত্রণ করে।
আজ রোসাটম ইউরেনিয়াম খনন, জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ, রিঅ্যাক্টর ডিজাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা, এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত সবকিছুই এক ছাতার নিচে পরিচালনা করে।
ফিনল্যান্ডের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মার্কো সিদ্দি বলেন, এই “ওয়ান স্টপ মডেল” রাশিয়াকে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে রোসাটমের কর্মীরাই বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করেন।
তার মতে, যেসব দেশ নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা তৈরি করে না, তাদের জন্য এটি সহজ পথ হলেও এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা তৈরি হয়।
বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নির্ভরতা
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার পারমাণবিক প্রকল্পগুলো শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গভীর নির্ভরতা তৈরি করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে রূপপুর প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ রাশিয়ার ঋণ থেকে এসেছে। তুরস্কেও রাশিয়া বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থায়ন দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টনি আরউইন বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার মতো উদার অর্থায়ন দেয় না। ফলে রাশিয়া স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য দেশগুলোকে নিজের সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারে।
তিনি বলেন, এটি রাশিয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক লাভ এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনের একটি মাধ্যম।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন। ছবি : সংগৃহীত
“গ্রাহক নয়, অংশীদার চায় রাশিয়া”
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া পারমাণবিক চুক্তিকে শুধু বাণিজ্যিক লেনদেন হিসেবে দেখে না, বরং কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে বিবেচনা করে।
২০১৮ সালে চীনের সঙ্গে চারটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বড় অস্ত্র চুক্তি এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বেন জালা বলেন, রাশিয়া সবসময় শুধু গ্রাহক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার তৈরি করতে চায়।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার তেল ও গ্যাস খাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলেও পারমাণবিক খাত তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ এই খাতে বিকল্প সরবরাহকারী দেশ কম এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তিতে রাশিয়ার অবস্থান এখনো শক্তিশালী।
যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু দেশ রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করলেও ফিনল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ আগের চুক্তি বাতিল করেছে।
তবে হাঙ্গেরি ও এশিয়ার অনেক দেশ এখনো রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে।
এশিয়ার দিকে রাশিয়ার সম্প্রসারণ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নতুন পারমাণবিক ক্ষমতার ৮০ শতাংশের বেশি এসেছে এশিয়া থেকে। রাশিয়া এখন ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নতুন প্রকল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দেশ মূলত দ্রুত বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদা, কার্বন নিঃসরণ কমানোর বাধ্যবাধকতা এবং সীমিত বিকল্প প্রযুক্তির কারণে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে।
পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে পিছিয়ে পড়ছে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিপুল ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে।
ফ্রান্সসহ অনেক দেশে সরকারি বিনিয়োগ যুক্তি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে নবায়নযোগ্য শক্তি তুলনামূলকভাবে সস্তা ও দ্রুত বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে ১০টি নতুন পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের লক্ষ্য নিয়েছে, তবে ইউরোপের অনেক বড় প্রকল্প সময় ও বাজেট ছাড়িয়ে গেছে।
উদাহরণ হিসেবে ফিনল্যান্ডের অলকিলুওটো-৩ চুল্লি ১০ বছরের বেশি দেরিতে চালু হয় এবং খরচ প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। যুক্তরাজ্যের হিঙ্কলি পয়েন্ট সি প্রকল্পও দ্বিগুণ ব্যয় এবং দেরির মুখে পড়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগ ও বিতর্ক
রাশিয়ার পারমাণবিক প্রকল্পগুলোতে একাধিকবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন রূপপুর প্রকল্পে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত শুরু করে। তবে রোসাটম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, এটি প্রকল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা।
রাশিয়ার কৌশল কি আলাদা?
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার কৌশল অনন্য নয়। ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতও বিভিন্ন সময় পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য ব্যবহার করেছে।
উদাহরণ হিসেবে ২০০৮ সালের ভারত-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিকে উল্লেখ করা হয়, যা পরবর্তীতে অস্ত্র বিক্রির পথও খুলে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় শক্তিগুলো সাধারণত রপ্তানি শিল্পকে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করে। রাশিয়ার বর্তমান কৌশলও সেই বৈশ্বিক প্রবণতারই অংশ, তবে বর্তমান সময়ে তারা সবচেয়ে সক্রিয় এবং সফল খেলোয়াড় হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au