নতুন হামলার জেরে হরমুজ প্রণালিতে কমেছে জাহাজ চলাচল
মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও…
মেলবোর্ন, ২৬ মে- ঈদুল আজহাকে ঘিরে সারা দেশে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত ও ভ্রমণের কারণে দেশে হামের সংক্রমণ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে গণপরিবহন, ঈদযাত্রার ভিড় এবং গ্রামে-শহরে মানুষের মেলামেশার ফলে আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমে অজান্তেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে ঈদের ছুটিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে সরকার। তবে ঈদযাত্রা সীমিত করার বিষয়ে এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
এদিকে দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং একজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে হয়েছে। গত ৭১ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪৫ জনে। এর মধ্যে ৪৫৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৮৭ শিশুর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির বিষয় হলো রোগটি ছড়িয়ে পড়ে অনেক আগেই, যখন রোগী নিজেও বুঝতে পারে না যে সে আক্রান্ত। শরীরে র্যাশ বা গুটি ওঠার অন্তত চার দিন আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে শুরু করে। ফলে ঈদযাত্রার সময় বাস, ট্রেন, লঞ্চ বা ভিড়পূর্ণ পরিবেশে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি শত শত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন।

হামের চিকিৎসার জন্য ডিএনসিসি হাসপাতালে আনা হয়েছে এক বছরের শিশুকে। ছবিঃ সংগৃহীত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, ঈদের সময় পরিবারগুলো শিশুদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি ও বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করবে। এতে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ঈদের পরবর্তী এক সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে মৃত্যুও বাড়বে, বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।
তিনি অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা আগে থেকেই অসুস্থ, তাদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ না করাই ভালো। এতে শুধু ওই শিশুর নয়, তার সংস্পর্শে আসা অন্য শিশুদেরও ঝুঁকি তৈরি হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন বলেন, ঈদের সময় মানুষের চলাচল সবচেয়ে বেশি থাকে। যাদের শরীরে হামের ভাইরাস রয়েছে, তারা অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তারা আক্রান্ত। কারণ, র্যাশ ওঠার আগেই সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। ফলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই অনেকের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, পরিবারের কারও জ্বর, সর্দি, কাশি বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ থাকলে তাকে নিয়ে ভ্রমণ করা উচিত নয়।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ওয়ার্ড আইসিইউ ইউনিটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অনেক ক্ষেত্রে হামের শুরুতে শুধু হালকা জ্বর দেখা দেয়। তখন রোগটি গুরুতর বলে মনে না হলেও ওই সময় থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। ফলে ঈদের ভিড়ে এই রোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, গ্রামে গেলে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই একসঙ্গে খেলাধুলা ও মেলামেশা করে। সেখানে কে আক্রান্ত আর কার শরীরে ভাইরাস রয়েছে, তা সহজে বোঝা যায় না। ফলে সুস্থ শিশুরাও সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। ওই বাতাসে শ্বাস নিলেও সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিস স্পর্শ করে চোখ-মুখে হাত দিলেও ঝুঁকি থাকে। তিনি বলেন, ঈদে পরিবারগুলো শিশুদের নিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাচ্ছে। এতে আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে এসে সুস্থ শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকা হামসহ অন্যান্য টিকার মজুত কতটা আছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে । ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশুদের নিয়ে দূরে ভ্রমণ না করাই ভালো। ঈদে বিভিন্ন এলাকার মানুষ একত্র হলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই মা-বাবাকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।
সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঈদের সময় চিকিৎসাসেবা সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ড এবং হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিত রাখতে বলা হয়েছে। যেসব হাসপাতালে হাম রোগীদের চিকিৎসা চলছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
রোববার সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের রোগী এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কোনো চিকিৎসক বা নার্সের ছুটি হবে না। ঈদের ছুটির মধ্যেও আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা চালু থাকবে। তিনি অভিভাবকদের ভিড় এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে না যাওয়াই ভালো।
তবে শুধু ঈদযাত্রাকেই সংক্রমণ বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, দেশে এখনও সব এলাকায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। তিনি আরও বলেন, প্রচণ্ড গরমে শিশুরা সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে হাম হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে যেতে পারে। তাই ছোট শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১ হাজার ১২৭ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ১ হাজার ২৭ শিশু। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪২৭ জন ঢাকা বিভাগের। এছাড়া চট্টগ্রামে ২০৮ জন, বরিশালে ১২৮ জন এবং খুলনায় ৯৫ জন ভর্তি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ৪০৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ দেশে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে গত ৭১ দিনে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৯৪০ জনে। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৫৮৫ জন। মোট নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৭১৯ জন। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৪৭ হাজার ৬১৯ জন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au