শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কি সত্যিই মস্তিষ্কের ক্ষতি করে? গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ভিডিও গেম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে দীর্ঘদিন ধরেই অভিভাবকদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কি শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে? অনেক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞের মতামতে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকলে শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা, আচরণগত সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মানসিক চাপ বাড়তে পারে। আবার সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। শুধু স্ক্রিন ব্যবহারের সময়কে শিশুদের মানসিক বা মস্তিষ্কের সমস্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।
গবেষণা কী বলছে?
যুক্তরাজ্যের বাথ স্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পিট এচেলস স্ক্রিন টাইম নিয়ে প্রকাশিত শত শত গবেষণা বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, সংবাদ মাধ্যমে যেভাবে স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হয়, বাস্তব বৈজ্ঞানিক তথ্য সবসময় সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। তার লেখা Unlocked: The Real Science of Screen Time বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, এ পর্যন্ত পরিচালিত অনেক গবেষণায় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে স্ক্রিন টাইমকে শিশুদের মানসিক সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে নিশ্চিত ভাবে বলা কঠিন। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ জন গবেষকের একটি দল ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৩৩টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখেছে, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ভিডিও গেম ব্যবহারের সঙ্গে শিশু ও কিশোরদের মানসিক সমস্যার সম্পর্ক খুবই সীমিত।
স্ক্রিন নয়, একাকীত্বও বড় কারণ হতে পারে। গবেষকদের মতে, এ বিষয়ে অধিকাংশ গবেষণা শিশু ও কিশোরদের নিজের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেছে। অর্থাৎ তারা নিজেরাই জানিয়েছে কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করেছে এবং এতে তাদের কেমন অনুভূতি হয়েছে। এমন তথ্য সব সময় নির্ভুল নাও হতে পারে। অধ্যাপক এচেলস বলেন, দুটি বিষয় একই সময়ে ঘটলেই একটি অন্যটির কারণ হয়ে যায় না। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, গ্রীষ্মকালে যেমন আইসক্রিম বিক্রি বাড়ে, তেমনি ত্বকের ক্যানসারের ঘটনাও বেড়ে যায়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আইসক্রিম খাওয়ার কারণে ক্যানসার হয়। উভয়ের পেছনেই গরম আবহাওয়া কাজ করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব তরুণ বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভুগছিল, তাদের মধ্যে মোবাইল ব্যবহারের হার বেশি ছিল। তবে বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের মানসিক সমস্যার মূল কারণ ছিল একাকীত্ব, মোবাইল ফোন নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ক্রিন ব্যবহার বলতে সব ধরনের কার্যক্রমকে একসঙ্গে বিবেচনা করা ঠিক নয়। একজন শিশু যদি অনলাইনে পড়াশোনা করে, নতুন কিছু শেখে অথবা বন্ধুদের সঙ্গে ইতিবাচক ভাবে যোগাযোগ করে, সেটির প্রভাব এক রকম। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচক বা উদ্বেগ সৃষ্টি করে এমন কনটেন্ট দেখা কিংবা উদ্দেশ্যহীনভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। অর্থাৎ, কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করা হচ্ছে তার পাশাপাশি কী ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গবেষকদের যৌথ এক গবেষণায় ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী ১১ হাজার ৫০০ শিশুর মস্তিষ্কের স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু অংশের সংযোগে পরিবর্তন দেখা গেলেও মানসিক সুস্থতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু প্রজিবিলস্কি বলেন, যদি স্ক্রিন সত্যিই শিশুদের মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করত, তাহলে এত বড় গবেষণায় তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যেত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ক্রিন টাইম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার না থাকলেও ইন্টারনেট ব্যবহারের কিছু বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। শিশুরা অনলাইনে ক্ষতিকর বা অশালীন কনটেন্টের মুখোমুখি হতে পারে। সাইবার বুলিং, প্রতারণা, অনলাইন হয়রানি কিংবা অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তিও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে যদি ঘুম কমে যায়, শারীরিক খেলাধুলা কমে যায় বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কমে যায়, তাহলে সেটিও উদ্বেগের বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিন টুয়েঞ্জ মনে করেন, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে কিশোরদের বিষন্নতা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। তার মতে, ১৬ বছরের আগে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন না দেওয়াই ভালো।
২০২৪ সালে ডেনমার্কে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুই সপ্তাহ স্ক্রিন ব্যবহারের সময় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে দিলে শিশু ও কিশোরদের মানসিক উপসর্গ কিছুটা কমে এবং ইতিবাচক সামাজিক আচরণ বাড়তে পারে। তবে গবেষকরা এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু স্ক্রিন ব্যবহারের সময় গণনা করাই যথেষ্ট নয়। বরং শিশু কী দেখছে, কী শিখছে এবং স্ক্রিনের বাইরে তার জীবন কতটা সক্রিয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো ধরনের স্ক্রিন ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছে। চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার না করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে তাদের শারীরিক কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। একদল গবেষক মনে করেন, অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণ নেই। অন্যদিকে আরেক দল বলছেন, সতর্ক থাকা জরুরি। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, শিশু কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কী করছে, কতটা ঘুমাচ্ছে, কতটা খেলাধুলা করছে এবং বাস্তব জীবনে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কতটা সময় কাটাচ্ছে। শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে এই ভারসাম্যই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুত্র; বিবিসি