বিশ্ব

অস্ট্রেলিয়ার জিএসটি ব্যবস্থায় ২৩ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়, সমালোচনার মুখে সরকার

  • 4:22 am - August 15, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩০ বার
উৎপাদনশীলতা কমিশন সতর্ক করে বলেছে, জিএসটি ব্যবস্থা সরকারের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।ফাইল ছবি

মেলবোর্ন, ১৫ আগষ্ট- অস্ট্রেলিয়ার পণ্য ও সেবা কর বা জিএসটি বণ্টনব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির উৎপাদনশীলতা কমিশনের এক অন্তর্বর্তী পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে করা জিএসটি সংস্কারের কারণে কেন্দ্রীয় সরকারকে গত কয়েক বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। অথচ এই সংস্কারের মূল সুবিধা পেয়েছে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া।

শুক্রবার প্রকাশিত ১১৬ পৃষ্ঠার অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে উৎপাদনশীলতা কমিশন বলেছে, ২০১৮ সালের সংস্কার বাস্তবায়নে যে ব্যয় হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, প্রকৃত ব্যয় হয়েছে তার প্রায় চার গুণ। কমিশনের মতে, বর্তমান ব্যবস্থা আগের তুলনায় আরও জটিল, কম সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান অ্যালেক্স রবসন বলেন, এই সংস্কারের ফলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা আগের তুলনায় বেশি জটিল এবং ব্যয়বহুল।

অস্ট্রেলিয়ায় ২০০০ সালে পণ্য ও সেবা কর বা জিএসটি চালু হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এই কর সংগ্রহ করে পরে অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলগুলোর মধ্যে বণ্টন করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা পরিচালনায় অঙ্গরাজ্যগুলো এই অর্থ ব্যবহার করে।

জিএসটি বণ্টনের মূল লক্ষ্য ছিল অঙ্গরাজ্যগুলোর আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। অর্থাৎ কোনো অঙ্গরাজ্যের রাজস্ব আয় তুলনামূলকভাবে কম হলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বেশি অর্থ দিয়ে তাদের এমন অবস্থায় রাখা, যাতে তারা অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোর মতো মানসম্মত সরকারি সেবা দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, ভৌগোলিক দুর্গমতা, সরকারি সেবা দেওয়ার ব্যয় এবং রাজস্ব আয়ের সক্ষমতার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তবে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার জিএসটি পাওয়ার অংশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ছিল। খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ এই রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব বাড়লেও জিএসটি বণ্টন ব্যবস্থায় তারা তুলনামূলকভাবে কম অর্থ পাচ্ছিল।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১৮ সালে জিএসটি বণ্টনব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনে তৎকালীন অস্ট্রেলীয় সরকার। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী স্কট মরিসনের সময় চালু হওয়া নতুন ব্যবস্থায় কোনো অঙ্গরাজ্যকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানে থাকা রাজ্যগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম জিএসটি পাওয়ার পরিস্থিতিতে না রাখার নীতি নেওয়া হয়।

একই সঙ্গে সংস্কারের ফলে কোনো অঙ্গরাজ্য যাতে হঠাৎ আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য কেন্দ্রীয় সরকার জিএসটি তহবিলে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

এর উদ্দেশ্য ছিল অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু উৎপাদনশীলতা কমিশনের সাম্প্রতিক পর্যালোচনা বলছে, বাস্তবে এই ব্যবস্থা প্রত্যাশিত ভারসাম্য তৈরি করতে পারেনি।কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের আগে অস্ট্রেলিয়ার সব অঙ্গরাজ্য তাদের নির্ধারিত আর্থিক প্রয়োজনের প্রায় ১০০ শতাংশ পূরণ করার মতো জিএসটি পেত।

কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে ১১৩ শতাংশে দাঁড়ায়। বিপরীতে অন্যান্য অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে গড় হার ছিল প্রায় ৯৮ শতাংশ।

অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বাড়তি জিএসটি সুবিধা পেয়েছে। অন্য অঙ্গরাজ্যগুলো যাতে সংস্কারের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ২৩ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।

কমিশনের মতে, এই অর্থ মূলত এমন একটি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ব্যয় হয়েছে, যার সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি পেয়েছে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া।
উৎপাদনশীলতা কমিশনার অ্যাঞ্জেলা জ্যাকসন বলেন, বর্তমান জিএসটি কাঠামো কার্যত দুটি আলাদা নিয়ম তৈরি করেছে। একটি ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার জন্য এবং অন্যটি বাকি অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলগুলোর জন্য।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো অঙ্গরাজ্য নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করলে সাধারণত তাদের প্রয়োজন কমেছে বলে ধরে নিয়ে জিএসটির অংশ কমে যেতে পারে। কিন্তু ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতিতে জিএসটি কমার সম্ভাবনা নেই। বরং কোনো কোনো পরিস্থিতিতে রাজ্যটি আরও বেশি অর্থ পেতে পারে।

কমিশনের মতে, এ ধরনের বৈষম্য জিএসটি বণ্টনের মূল উদ্দেশ্য এবং নীতিগত কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে।
উৎপাদনশীলতা কমিশন অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের আগে কার্যকর থাকা জিএসটি বণ্টনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করেছে।

একই সঙ্গে কমিশন বলেছে, কোনো অঙ্গরাজ্যের খনিজ সম্পদ আহরণসহ বিশেষ কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে রাজস্ব সক্ষমতায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে সেটিও জিএসটি বণ্টনের সময় বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

তবে কমিশনের অন্তর্বর্তী সুপারিশ নিয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে রাজি হননি প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ।
শুক্রবার ক্যানবেরায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বছরের শেষ দিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করবেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার রজার কুক এবং প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। ছবি: সংগৃহীত

তবে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে আলবানিজ বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে রাজ্যটির যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, তার ভিত্তিতে তারা ন্যায্য অংশ পাবে।

বর্তমান জিএসটি বণ্টনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব অঙ্গরাজ্যগুলোর একটি নিউ সাউথ ওয়েলস। রাজ্যটির প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার জন্য বাড়তি সুবিধার সমালোচনা করে নিজের রাজ্যের জন্য আরও ন্যায্য অংশ দাবি করেছেন।

মিন্সের অভিযোগ, বর্তমান ব্যবস্থার কারণে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া এতটাই সম্পদশালী হয়ে উঠেছে যে তারা নিউ সাউথ ওয়েলসের গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া ইভেন্টের স্বত্ব কেনার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বিপুল আয় করা অঞ্চলগুলোর মধ্যে এমন প্রবণতা দেখা যায়। তবে একটি রাজ্যের সম্পদ ও সমৃদ্ধি যেন অন্য রাজ্যের আর্থিক ক্ষতির কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

উৎপাদনশীলতা কমিশনের প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া সরকার।
রাজ্যটির প্রিমিয়ার রজার কুক বর্তমান জিএসটি সুবিধা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার দাবি, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এবং খনিজ সম্পদ থেকে অর্জিত রাজস্বের মাধ্যমে পুরো দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

কুক বলেন, কমিশনের প্রতিবেদন কেবল তথ্য ও পরিসংখ্যানের সংকলন নয়, বরং এটি ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার পরিশ্রমী মানুষের ওপর আক্রমণের মতো।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার মানুষ এই ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তার ভাষায়, পূর্ব উপকূলের অনেক মানুষ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক অবদান যথাযথভাবে বোঝেন না।

উৎপাদনশীলতা কমিশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এখনো চূড়ান্ত নয়। অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্য, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পক্ষের মতামত নেওয়া হবে।

এরপর আগামী ৩১ ডিসেম্বর কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জিএসটি বণ্টনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত সুপারিশ থাকবে। এরপরই সিদ্ধান্ত হবে, ২০১৮ সালে চালু হওয়া বিতর্কিত সংস্কার বহাল থাকবে, নাকি অস্ট্রেলিয়া আবার আগের বণ্টনব্যবস্থায় ফিরে যাবে।

এই বিতর্ক শুধু অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে অর্থ ভাগাভাগির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও অন্যান্য জনসেবায় অঙ্গরাজ্যগুলোর আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও সরাসরি জড়িত। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যগুলোর ভবিষ্যৎ আর্থিক সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র-নাইন কম এইউ

এই শাখার আরও খবর

বিজয়া দশমীতে সিঁদুরের রঙে আনন্দ, দেবী বিদায়ে বিষাদ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  ছয় দিনের পূজা-অর্চনা শেষে বিদায়ের পালা দেবী দুর্গার। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন, দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জনের মধ্য…

‘পাপের লাশ দেশে আসুক চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন বিএনপির এমপি

সৌদি আরবে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিরোধিতা করে ‘পাপের লাশ দেশে আসুক চাই না’ মন্তব্য করেছিলেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের…

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কি ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে?

সামরিক কৌশল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে একসঙ্গে চাপে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত, আঞ্চলিক মিত্রদের…

মাগুরায় যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ

মাগুরা পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সাকের হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর ৬টার দিকে মাগুরা বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টার…

ভক্তি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মহিমায় সিডনিতে দর্পণের শারদীয় দুর্গোৎসব

শতদল তালুকদার, সিডনি- শরতের স্নিগ্ধ আবহ, দেবীবন্দনার পবিত্র অনুরণন আর বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের আবাহনে সিডনিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। দর্পণ কালচারাল অ্যান্ড রিলিজিয়াস…

কুমিল্লাজুড়ে মাদকের ভয়াবহ থাবা, ২০০ হটস্পটে চলে বেচাকেনা

কুমিল্লার সীমান্ত দিয়ে দেদারছে ঢুকছে মাদক। পরে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। জেলার ১৮টি থানায় অন্তত ২০০টি হটস্পটে চলছে মাদক কেনাবেচা। সীমান্তের অর্ধশতাধিক পথ ব্যবহৃত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au