চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী ও তার মা। ছবিঃ সংগৃহীত
কারাগারে থাকা ছেলে সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে একনজর দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল মা সন্ধ্যা রানী ধরের। অসুস্থ অবস্থায় ছেলেকে দেখতে প্যারোলে মুক্তির আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ আর পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে একবার দেখার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রেখেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন সন্ধ্যা রানী ধর।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটের দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর আগে গত মঙ্গলবার নিজেই ওই আশ্রমে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বলে জানিয়েছে পরিবার। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসও দীর্ঘদিন এই আশ্রমে অবস্থান করেছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন সন্ধ্যা রানী ধর। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাঁর শরীরে ক্যানসার শনাক্ত হয়। তবে হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকতে চাইছিলেন না তিনি। ছেলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের স্মৃতি জড়িয়ে থাকা আশ্রমটিতেই জীবনের শেষ সময় কাটাতে চেয়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তাঁর মা। ছেলের অসুস্থতার খবর, বারবার জামিন না হওয়া এবং কারাগার থেকে তাঁর মুক্তি না পাওয়ায় তিনি গভীর দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন।
সর্বশেষ ছেলের জামিন শুনানিকে ঘিরে আশাবাদী হয়েছিলেন সন্ধ্যা রানী ধর। পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা ছিল, জামিন হলে হয়তো ছেলেকে দেখতে পারবেন তিনি। কিন্তু জামিন না হওয়ায় তাঁর উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় বলে পরিবারের দাবি।
এর মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের মধ্যে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর হৃদ্যন্ত্রেও জটিলতা দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
অসুস্থ মাকে একবার দেখতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার আবেদন করেছিল তাঁর পরিবার। তবে সেই আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে অসুস্থ মায়ের সঙ্গে ছেলের আর দেখা হয়নি।
পরিবারের দাবি, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই ছেলেকে নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছিলেন সন্ধ্যা রানী ধর। ছেলের অসুস্থতার খবর পেলেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন। এর আগেও ছেলের অসুস্থতার খবর শুনে তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
দীর্ঘদিনের উৎকণ্ঠা, ছেলের জামিন না হওয়া এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করতে না পারার কষ্টে শেষ জীবনে আরও ভেঙে পড়েছিলেন সন্ধ্যা রাণী ধর। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি ছেলেকে একবার দেখার আকাঙ্ক্ষাও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।
গত মঙ্গলবার অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সেখানে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরও কারাগারে থাকা ছেলের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার সুযোগ হয়নি।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁকে ঘিরে চলমান মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কারাবন্দি। অন্যদিকে, তাঁর মায়ের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে মানবিক কারণে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার দাবি ওঠে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, একজন মা হিসেবে জীবনের শেষ সময়ে তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি ছিল ছেলেকে একবার চোখের সামনে দেখা। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
মায়ের মৃত্যুর সময়ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাস কারাগারে থাকায় শেষবারের মতো মায়ের মুখ দেখার সুযোগ তিনি পাবেন কি না, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
সন্ধ্যা রানী ধরের মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ছেলেকে দেখার অপেক্ষায় থাকা একজন মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ না হওয়ার বিষয়টি পরিবার ও তাঁর স্বজনদের কাছে গভীর বেদনার হয়ে দাঁড়িয়েছে।