বিশ্ব

টুইন টাওয়ার হামলার ২৫ বছর, কি হয়েছিল সেদিন?

  • 4:38 pm - September 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৪৯ বার
ছিনতাই করা উড়োজাহাজের আঘাতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দ্বিতীয় টাওয়ারে আগুন ধরে যায়। ছবি: রয়টার্স

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ওই হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনীতিতেই বড় পরিবর্তন আনেনি, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, অভিবাসন, মানবাধিকার ও সামরিক নীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

২০০১ সালের ওই হামলায় আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯ জন সন্ত্রাসী চারটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ছিনতাই করে। এর মধ্যে দুটি উড়োজাহাজ নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। আরেকটি আঘাত করে ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে। চতুর্থ উড়োজাহাজটি যাত্রী ও ক্রুদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। ওই হামলায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ হামলার পর ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযান শুরু করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়।

বদলে যায় বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সন্ত্রাসবাদকে প্রচলিত আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে ‘যুদ্ধের’ দৃষ্টিভঙ্গিতে মোকাবিলার নীতি গ্রহণ করা হয়।

ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বৈশ্বিক অভিযান, যার আওতায় আফগানিস্তান ও ইরাকে সরাসরি যুদ্ধ এবং ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর ফলে সামরিক ও গোয়েন্দা খাতে ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বিমানবন্দর, সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

তবে এই যুদ্ধ নিয়ে শুরু থেকেই ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে বিচার ছাড়াই বহু মানুষকে আটক করা হয় এবং আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। ড্রোন হামলার মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের হত্যার বিষয়েও মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন।

আফগানিস্তান যুদ্ধের দীর্ঘ প্রভাব

৯/১১ হামলার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে। মূল লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন এবং সংগঠনটির অন্য নেতাদের আটক করা এবং তালেবান সরকারকে সরিয়ে দেওয়া।

আফগানিস্তান থেকে বিদায় নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী। ছবি: রয়টার্স

প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই যুদ্ধ ২০২১ সালে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর আফগানিস্তান ছাড়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ৩২৪ সেনা ও ৩ হাজার ৯১৭ জন সামরিক ঠিকাদার নিহত হন। মিত্র বাহিনীরও ১ হাজার ১১৪ জন সদস্য নিহত হন।

এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায় বলে ওই তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আফগানিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক মানুষেরও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।

ইরাক যুদ্ধ ও বিতর্ক

৯/১১ হামলার দুই বছরের মধ্যে ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট। সে সময় ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ সামনে আনা হয়েছিল। পরে ইরাকে এমন অস্ত্রের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে।

বিমানহামলায় কেঁপে উঠছে বাগদাদ । ছবি: রয়টার্স

২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চলা ইরাক যুদ্ধে বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে অন্তত ৪ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনা ও প্রায় ১ লাখ ইরাকি নিহত হন। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের একটি প্রতিবেদনে ইরাক যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুসলিমদের ওপর বাড়ে চাপ

৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের ওপর সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপও বেড়ে যায় বলে বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী ও লেখক দাবি করেছেন। সন্দেহের ভিত্তিতে মুসলিমদের আটক, জিজ্ঞাসাবাদ এবং সামাজিকভাবে হয়রানির নানা ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে।

মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক রোজিনা আলির বক্তব্য অনুযায়ী, ৯/১১-এর আগে তাকে মূলত দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসী হিসেবে দেখা হলেও হামলার পর তার মুসলিম পরিচয়টি সামনে চলে আসে। তার মতে, হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস বেড়ে যায়।

২৫ বছর পর নিউইয়র্কে মামদানিকে ঘিরে বিতর্ক

টুইন টাওয়ার হামলার ২৫ বছর পূর্তির সময় নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানিকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হামলার সময় মামদানির বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর। তিনি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ৯/১১ স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

তবে তার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কয়েকজন সাবেক মার্কিন রাজনীতিকসহ অনেকে। প্রায় ১ লাখ মানুষ একটি আবেদনে সই করে মামদানিকে স্মরণানুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাদের দাবি, ৯/১১ হামলায় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সম্মান দেখাতে স্মরণানুষ্ঠানটি রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখা উচিত। সাবেক নিউইয়র্ক মেয়র রুডি জুলিয়ানি এবং সাবেক গভর্নর জর্জ প্যাটাকিও মামদানির অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

রুডি জুলিয়ানি বলেছেন, মামদানি অনুষ্ঠানে যোগ দিলে তিনি ক্ষুব্ধ হবেন। অন্যদিকে জর্জ প্যাটাকি মনে করেন, ৯/১১ হামলায় নিহতদের স্মরণসভায় মামদানির অংশ নেওয়া উচিত নয়।

ছবি: রয়টার্স

তবে মামদানি নিজে স্মরণানুষ্ঠানকে রাজনৈতিক বিতর্কে না জড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। চলতি বছর তিনি ১১ সেপ্টেম্বরকে নিউইয়র্কে ‘স্মরণ ও প্রার্থনা’ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এদিন নিহতদের স্মরণের পাশাপাশি উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মামদানি এর আগে ৯/১১ হামলার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসা বৈষম্য ও হয়রানির বিষয়ও তুলে ধরেছেন। তার সমর্থকদের মতে, নিহতদের স্মরণ করা এবং হামলার পরবর্তী যুদ্ধ ও বৈষম্যের প্রভাব নিয়ে কথা বলা পরস্পরবিরোধী নয়।

অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, গ্রাউন্ড জিরোকে দলীয় বা রাজনৈতিক বক্তব্যের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তাদের মতে, এটি ৯/১১ হামলায় নিহতদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

২৫ বছর পরও ৯/১১-এর প্রভাব তাই শুধু স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ নেই। বৈশ্বিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ, অভিবাসন, মুসলিমদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক বিতর্কে এর প্রভাব এখনো স্পষ্ট। নিউইয়র্কে জোহরান মামদানিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কও সেই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেরই একটি নতুন প্রতিফলন।

এই শাখার আরও খবর

সিপিবির মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে হামলা, মারধর

ঢাকায় পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন…

হুজুরদের ভয়ে শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়লেন যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুর বাবা শাহজালাল রুমি

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী মেয়েশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় আলোচনায় আসা বাবা বডিবিল্ডার শাহজালাল রুমি দেশ ছেড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে…

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও অপসারণের দাবি জানল টিআইবি

সরকারের অনুমতি পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে বলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি…

ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক, সৌদিকে সামরিক সহায়তা দেবে মিসর

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা কমাতে ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে…

রিয়াদ বিমানবন্দরে আবারও হামলার দাবি হুতিদের, পাল্টা অভিযানে সৌদি জোট

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাম্পিং স্টেশনগুলোতে ড্রোন হামলার দাবি…

সুনামগঞ্জে পুলিশের উপস্থিতিতে কৃপেশ রায়ের বাড়িতে মব, পরে গ্রেপ্তার

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হিন্দু যুবক কৃপেশ রায়ের বাড়িতে পুলিশের উপস্থিতিতে একদল লোক জড়ো হয়ে মব সৃষ্টি করেছে। এ সময় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au