বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের উত্থান, কেন্দ্রে ভারত।
দুই দশক আগে বিশ্ব রাজনীতিতে উন্নত ও ধনী দেশগুলোর জোট জি৭-এর প্রভাবই ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই সময় ২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন একসঙ্গে একটি নতুন জোট গঠনের উদ্যোগ নেয়। শুরুতে অনেকেই এই জোটকে ছোট ও সীমিত প্রভাবের সংগঠন হিসেবে দেখেছিলেন। তবে ২০ বছরের ব্যবধানে সেই ব্রিকসই এখন বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আর এই জোটের বর্তমান প্রভাবের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ভারত।
চলতি বছরের ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। চতুর্থবারের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজক হয়েছে ভারত। সামরিক উত্তেজনা, বাণিজ্যিক সংঘাত এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সময়ে এবারের সম্মেলনে স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, টেকসই উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্রিকসের সম্মিলিত অবদান ছিল ২০ শতাংশের কিছু বেশি। তখন জি৭-এর তুলনায় জোটটির অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল অনেক কম। কিন্তু গত দুই দশকে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়া এবং ভারত ও চীনের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির দ্রুত উত্থানের ফলে পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে বদলে গেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালেই বৈশ্বিক জিডিপির হিসাবে জি৭-কে ছাড়িয়ে যায় ব্রিকস। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৪১ শতাংশ ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর কাছ থেকে আসতে পারে। বিপরীতে জি৭-এর অংশ হতে পারে প্রায় ২৮ শতাংশ।
বর্তমানে ব্রিকস ১১ সদস্যের জোট। তবে এর অর্থনৈতিক শক্তির বড় অংশ আসে চীন ও ভারত থেকে। জোটের মোট জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশই এই দুই দেশের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে চীনের অংশ প্রায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতের ২০ দশমিক ৭ শতাংশ। বাকি অংশে রয়েছে রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, সৌদি আরবসহ অন্যান্য সদস্যদেশ।
ভারতের জন্য ব্রিকস এখন শুধু একটি আন্তর্জাতিক জোট নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৪১ শতাংশ এবং রপ্তানির প্রায় ২২ শতাংশ ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে হয়ে থাকে।
এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীন ভারতের অন্যতম প্রধান অংশীদার। অন্যদিকে রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল পাওয়ায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায়ও মস্কোর গুরুত্ব বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার, বিশেষ করে মুক্তা, মূল্যবান পাথর ও স্বর্ণালংকার রপ্তানির ক্ষেত্রে। ফলে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশই এখন ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত।
ব্রিকস ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রবাসী জনগোষ্ঠীর দিক থেকেও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের একটি বড় অংশ ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোতে অবস্থান করছেন। শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবেই ৭০ লাখের বেশি ভারতীয় বসবাস করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও প্রায় ১৮ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস রয়েছে। ফলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও ভারতের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পর ব্রিকসের উত্থান বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার কাঠামোতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্র ধীরে ধীরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাইরে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর দিকে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে ব্রিকস।
এ অবস্থায় নয়াদিল্লির ব্রিকস নেতৃত্ব ভারতের জন্য শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ নয়, বরং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে নিজেদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করার একটি বড় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দশক আগে যে জোটকে তুলনামূলক ছোট উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই এখন বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আর সেই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ভারত ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকায় উঠে আসছে।