আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে রাশেদ খাঁনের নানা অভিযোগ
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্যদের ‘প্রটেকশন’ ও পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী (সচিব…
মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ সাত মাস। অবশেষে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয়রা তাকে শনাক্ত করেন। খবর পেয়ে বাবা নাজিম উদ্দিন ছুটে এসে ছেলেকে উদ্ধার করেন। তবে সুস্থ-সবল অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হওয়া রায়হান ফিরেছে ডান পা হারিয়ে। তার পেটের ডান পাশে ও পিঠেও রয়েছে অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ দাগ।
পরিবারের অভিযোগ, একটি অপরাধী চক্র রায়হানকে আটকে রেখে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করেছে। এমনকি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে বিক্রি করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে পরিবার। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে তদন্ত ও সত্যতা যাচাই এখনো হয়নি।
রায়হানের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকায়। তার বাবা নাজিম উদ্দিন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। রায়হান হেফজখানায় পড়াশোনা করত।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজার চলে যায়। সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে যায়। পরে কয়েকজন তাকে চারপাশে বাগান এবং মাঝখানে একটি ঘর রয়েছে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে তার মতো আরও অনেক ছেলে-মেয়েকে দেখতে পায় বলে জানায় সে।
রায়হান জানায়, সেখানে এক রাতে ঘুমানোর পর সকালে উঠে সে দেখতে পায় তার একটি পা নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, ট্রেন দুর্ঘটনায় তার পা কেটে গেছে। এরপর প্রতিদিন তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করানো হতো। ভিক্ষার টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো বলেও দাবি করেছে শিশুটি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে দুইজন পুরুষ ও সালমা নামে এক নারী ছিল। ওই জায়গায় আরও অনেক মানুষের হাত-পা কাটা ছিল বলেও জানিয়েছে রায়হান। পরে তাকে একটি বাসে তুলে দেওয়া হলে সে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় চলে আসে।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, ছেলে কিছুটা দুষ্টুমি করত বলে মাঝে মাঝে তাকে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতেন। ঘটনার দিন ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে পাঠানোর পর সে আর বাড়িতে ফেরেনি। সাত মাস পর মাহফিল এলাকায় ছেলেকে এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করতে দেখে তিনি ছুটে যান।
নাজিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর অর্থের অভাবে থানায় জিডি করতে পারেননি। ছেলে ফিরে আসার পর লোহাগাড়া থানায় অভিযোগ করতে গেলে তাকে ঢাকার কমলাপুর সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। তার দাবি, দরিদ্র হওয়ার কারণে ঢাকায় গিয়ে মামলা করার মতো সামর্থ্য তার নেই।
রায়হানের সৎমা ফয়জুন্নেসা বলেন, সাত মাস পর ছেলেকে ফিরে পেলেও তার একটি পা নেই এবং পেটেও বড় অস্ত্রোপচারের দাগ রয়েছে। সন্তানের সঙ্গে এমন নির্মমতার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি।
সীরাত মাহফিলে রায়হানকে প্রথম শনাক্ত করেন স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী। তিনি জানান, রাত ১২টার পর মাহফিলের ভিড়ে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখেন। মুখ পরিচিত মনে হওয়ায় কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করলে শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে নিজের পরিচয় দেয়। পরে নাজিম উদ্দিনকে ফোন করে খবর দেওয়া হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, রায়হানের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। ১২ বছরের শিশুর সঙ্গে এমন ঘটনা অত্যন্ত নৃশংস। তিনি দ্রুত ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
মানবাধিকার কর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদীও ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, শিশুটির বক্তব্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
তবে রায়হানকে থানায় নিয়ে গিয়ে আইনি সহায়তা না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, রায়হান নিখোঁজ হওয়ার সময় তার পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ বা জিডি করেনি।
পুলিশ পরিদর্শক প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে, রায়হান প্রায় এক মাস কক্সবাজারে ছিল। পরে তাকে কমলাপুরে নেওয়া হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রায়হান নিখোঁজ থাকার সময়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। ওই ভিডিওতে শিশুটিকে বলতে দেখা যায়, জায়গা সংক্রান্ত মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমা তাকে মারধর করায় সে ট্রেনের ছাদে উঠে ঢাকায় চলে এসেছে। তবে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভয় দেখিয়ে বা কারও শেখানো কথায় শিশুটি ভিডিওতে এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে।
মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। রায়হানের ঘটনায় শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত কোনো চক্র আছে কি না, তা দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ শিশুদের বড় একটি অংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষাবৃত্তির সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের জন্য সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ এবং দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দেন তিনি।
রায়হানের পরিবারের এখন একটাই দাবি, তাদের সন্তানের সঙ্গে কী ঘটেছিল তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au