দুই বছর ধরে কারাগারে শ্যামল দত্তসহ সাংবাদিকরা, মুক্তির দাবি
দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তসহ কয়েকজন সাংবাদিকের মুক্তি দাবি করেছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক…
ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঙালি ছিনিয়ে এনেছে লাল-সবুজের পতাকা। সেই পতাকা কেবল একটি রাষ্ট্রের প্রতীক নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন অস্তিত্বের প্রতীক।
এই দেশ আমাদের। এই মাটি আমাদের। এই ভূখণ্ডের ইতিহাসও আমাদের।
কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর একটি প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে: বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে আমরা কীভাবে দেখব? পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে, সেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নতুন করে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে? ইতিহাসের অংশ হিসেবে তাকে আলোচনা করা হবে, নাকি তাকে এমন এক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করা হবে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসকেই নতুন করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংস্কার করা জাদুঘরে জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক এই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে এনেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর জাদুঘরটি নতুনভাবে চালু হওয়ার পর সেখানে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শিত হয়। একই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের আগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ একক ছবি আর দেখা যায়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিবাদ শুরু হয়। পরে একজন শিক্ষার্থী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন এবং অন্য একদল শিক্ষার্থী জিন্নাহ ও গোলাম আজমের ছবি মাটিতে রেখে প্রতিবাদ করেন।
ডাকসুর পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য তাকে মহিমান্বিত করা নয়, বরং ইতিহাসের একটি পর্যায়কে তুলে ধরা। ছবির সঙ্গে তার ১৯৪৮ সালের ভাষা-সংক্রান্ত অবস্থানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিতর্কটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি প্রদর্শন কি তাকে সম্মান জানানো, নাকি তার ভূমিকা ও সময়কে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা? এই পার্থক্যটি স্পষ্ট না হলে ইতিহাসচর্চা সহজেই রাজনৈতিক প্রতীকের লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।
কিন্তু জিন্নাহকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি বড় অংশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের ইতিহাস।
জিন্নাহ এবং বাংলা ভাষার প্রশ্ন
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভাষা আন্দোলন। আর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে জিন্নাহর অবস্থানও স্পষ্ট।
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় জিন্নাহ ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা ছিল বাংলা। ফলে তার এই অবস্থান পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বাংলাপিডিয়াতেও ২১ মার্চ ১৯৪৮-এর সেই ঘোষণার কথা উল্লেখ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল হয়ে উঠেছিল এই বিরোধিতার অন্যতম কেন্দ্র। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জিন্নাহর ‘উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ অবস্থান প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে সামনে নিয়ে আসে।
এখানেই ইতিহাসের একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রশ্নেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনমনীয় থাকে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার কতটা নিরাপদ ছিল?
ভাষার প্রশ্নটি তাই শুধু ভাষার প্রশ্ন ছিল না। এটি ছিল ক্ষমতার প্রশ্ন। এটি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাজনৈতিক মর্যাদার প্রশ্ন। এটি ছিল রাষ্ট্রে কার পরিচয় প্রাধান্য পাবে, সেই প্রশ্ন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সেই প্রশ্নকে আরও বিস্তৃত করে। সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ বহু মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিটি আর কেবল একটি ভাষার দাবি থাকেনি। এটি বাঙালির রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব
জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় যে রাষ্ট্রের কল্পনা করা হয়েছিল, তার সঙ্গে পরবর্তী পাকিস্তানের বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান ছিল। পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায় প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি এবং সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে বিরোধ ক্রমেই তীব্র হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। সেই পরিস্থিতি থেকেই মুক্তিযুদ্ধ সর্বাত্মক রূপ নেয়। বাংলাপিডিয়ার ইতিহাস বিষয়ক নিবন্ধেও ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের সূচনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে কোনো আকস্মিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নয়। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত।
সেই কারণেই বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে পাকিস্তানকে নিয়ে আলোচনা কখনোই নিছক নস্টালজিয়ার বিষয় হতে পারে না।
পাকিস্তানি গান শোনা যাবে কি না, পাকিস্তানি পোশাক পরা যাবে কি না, পাকিস্তানের ক্রিকেট দলকে সমর্থন করা যাবে কি না, এসব ব্যক্তিগত পছন্দের প্রশ্ন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকের সাংস্কৃতিক পছন্দকে রাষ্ট্রদ্রোহ বা স্বাধীনতাবিরোধিতার মাপকাঠি বানানোও ঠিক নয়।
কিন্তু যখন কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে চায়, ১৯৭১-এর গণহত্যাকে খাটো করে, মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কিংবা পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে হাজির করে, তখন বিষয়টি আর ব্যক্তিগত সংস্কৃতির প্রশ্ন থাকে না। তখন তা রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
জিন্নাহর ছবি কি ইতিহাস, নাকি রাজনৈতিক বার্তা?
ডাকসুর জাদুঘরে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে মূল বিতর্কটি এখানেই।
কোনো জাদুঘরে জিন্নাহর ছবি থাকবে না, এমন কোনো চিরস্থায়ী নিয়ম নেই। বরং পাকিস্তান আমলের ইতিহাস বোঝাতে জিন্নাহর ছবি থাকা যুক্তিসঙ্গতও হতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন ঐতিহাসিক চরিত্রের ভূমিকা ব্যাখ্যা না করে তাকে কেবল সম্মানের প্রতীকে পরিণত করা হয়।
একটি জাদুঘরের দায়িত্ব ইতিহাসকে দেখানো। ইতিহাসকে সাজিয়ে দেওয়া নয়।
জিন্নাহর ছবি থাকলে তার পাশে ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা থাকতে হবে। ভাষা আন্দোলনের প্রতিক্রিয়াও থাকতে হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে পূর্ব বাংলার বঞ্চনার ইতিহাস থাকতে হবে। ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ এবং ১৯৭১-এর ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।
তাহলেই একজন দর্শক বুঝতে পারবেন, জিন্নাহ কে ছিলেন, পাকিস্তান কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং কেন শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছিল।
কিন্তু ইতিহাসের একটি অংশ দেখিয়ে অন্য অংশ বাদ দেওয়া হলে প্রশ্ন উঠবেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও বিতর্কের পর বলেছে, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি তারা গ্রহণযোগ্য মনে করে না এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
৫ আগস্টের পর পাকিস্তান প্রসঙ্গ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এটি বাস্তবতা। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা যোগাযোগ বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের একজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা পাকিস্তান সফর করেন এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল।
এর পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ বিরতির পর কূটনৈতিক আলোচনা আবার শুরু হয়। বাণিজ্য, ভ্রমণ, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যোগাযোগ বৃদ্ধির খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কোনো স্বাধীন দেশের অন্য একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা নিজেই অপরাধ নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতেই পারে। যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, চীনের সঙ্গে থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও থাকবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সম্পর্কের ভিত্তি কী?
বাংলাদেশ কি নিজের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক করবে, নাকি কোনো বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হয়ে যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তব কর্মকাণ্ড দেখতে হবে।
আইএসআই প্রসঙ্গেও সতর্ক থাকা দরকার
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের একটি প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর নিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তখন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মালিক বাংলাদেশ সফর করছেন বলে যে খবর ছড়িয়েছে, সেটি সত্য নয়। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আইএসআইয়ের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসার কথা বলা হয়েছিল।
তাই ‘আইএসআই প্রধান ঢাকায় এসে বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছেন’ ধরনের দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
তবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক ও নিরাপত্তা যোগাযোগ বাড়ছে, এটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সেই যোগাযোগ কতটা গভীর, কী বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সেখানে কতটা সুরক্ষিত থাকছে, তা নিয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
এখানে সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রীয় নীতির জন্য একই শিক্ষা প্রযোজ্য: সন্দেহকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। আবার তথ্যকে অস্বস্তিকর বলে এড়িয়ে যাওয়াও উচিত নয়।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই কি পাকিস্তান হয়ে যাওয়া?
একেবারেই নয়।
বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে, কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারে, ক্রিকেট খেলতে পারে, সাংস্কৃতিক বিনিময় করতে পারে। এমনকি দুই দেশের মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও থাকতে পারে।
কিন্তু রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার সংবিধান, ইতিহাস, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার এবং স্বাধীনতার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে পাকিস্তানের পরিচয়ের সঙ্গে একাকার করা সম্ভব নয়।
ভারতবিরোধিতা আর পাকিস্তানপ্রীতি একই জিনিস নয়। একইভাবে ভারতপ্রীতি আর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থও এক জিনিস নয়। বাংলাদেশকে এই দুই মেরুর বাইরে নিজের স্বার্থের জায়গা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যদি হয় ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’, তাহলে পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেটিই প্রযোজ্য। তবে সেই বন্ধুত্বের বিনিময়ে ইতিহাস বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তাহলে ‘নতুন পাকিস্তান’ কারা চায়?
এই প্রশ্নের সবচেয়ে সহজ উত্তর হয়তো কোনো ব্যক্তি বা দলের নাম বলা। কিন্তু সেটিই সবচেয়ে দুর্বল উত্তর।
কারণ একটি দেশকে ‘নতুন পাকিস্তান’ বানানোর প্রকল্প থাকলে তার প্রমাণ খুঁজতে হবে নীতি ও কর্মকাণ্ডে।
কে ১৯৭১-এর ইতিহাস অস্বীকার করছে?
কে মুক্তিযুদ্ধকে অপ্রাসঙ্গিক করতে চাইছে?
কে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে খাটো করছে?
কে যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসকে মুছে দিতে চাইছে?
কে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের রাজনৈতিক কাঠামোকে বাংলাদেশের জন্য আদর্শ হিসেবে হাজির করছে?
কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাইছে?
আর কে ইতিহাসের জটিলতা স্বীকার করেও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে চাইছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এক নয়। সব পাকিস্তানপন্থী সাংস্কৃতিক প্রবণতা পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রকল্প নয়। আবার সব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়।
এই পার্থক্য না করলে আমরা ইতিহাসকে বুঝব না, বরং ইতিহাসকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করব।
ইতিহাসের সঙ্গে আপস নয়
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইতিহাস।
ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। এগুলোকে আলাদা করে দেখলে বাংলাদেশের জন্মের ধারাবাহিকতা বোঝা যায় না।
তাই জিন্নাহকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলাও ভুল। তাকে দেবতা বানানোও ভুল।
জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং সেই রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল। তার রাজনৈতিক ভূমিকা ইতিহাসের অংশ। একই সঙ্গে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নে তার ১৯৪৮ সালের অবস্থানও ইতিহাসের অংশ। দুটোই একসঙ্গে বলতে হবে।
ইতিহাসকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই।
জিন্নাহর ছবি দেখলেই বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে না। আবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলিয়ে দিলে বাংলাদেশের আত্মপরিচয় দুর্বল হয়ে যাবে।
একটি পরিণত রাষ্ট্র তার ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ও প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু সেই প্রদর্শন যদি ব্যাখ্যাহীন হয়, যদি অপরাধ ও নিপীড়নের ইতিহাসকে আড়াল করে কেবল ব্যক্তিপূজা তৈরি করে, তখন প্রশ্ন উঠবেই।
আজ বাংলাদেশের সামনে তাই আসল প্রশ্ন ‘জিন্নাহর ছবি থাকবে কি থাকবে না’ নয়।
আসল প্রশ্ন হলো, ছবির পাশে ইতিহাসটাও থাকবে কি না।
আমরা কি ১৯৪৮-এর ভাষা-সংকট থেকে ১৯৫২-এর রক্তপাত, ১৯৭০-এর গণরায় এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পুরো ইতিহাসটি দেখাব?
নাকি ইতিহাস থেকে সুবিধাজনক কিছু ছবি তুলে এনে নতুন একটি রাজনৈতিক স্মৃতি নির্মাণ করব?
বাংলাদেশ কখনো পাকিস্তান ছিল না, এখনো পাকিস্তান নয়, ভবিষ্যতেও পাকিস্তান হওয়ার প্রশ্ন নেই। কিন্তু বাংলাদেশ কী হবে, সেটি নির্ধারণ করবে তার জনগণ, তার সংবিধান এবং তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে কি থাকবে না, তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা ঠিক করবেন। কিন্তু সেই সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক, বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের জায়গাটি বদলে যাবে না।
ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ কোনো কূটনৈতিক সমীকরণ নয়। ভাষাশহীদদের রক্ত কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের একক সম্পত্তিও নয়।
এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের ভিত্তি।
সুতরাং ‘নতুন পাকিস্তান’ বানানোর প্রশ্নটি যদি সত্যিই কখনো সামনে আসে, তার উত্তরও ইতিহাসের মধ্যেই আছে।
বাংলাদেশকে বাংলাদেশই থাকতে হবে।
আর বাংলাদেশকে বাংলাদেশ রাখার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, ইতিহাসকে দলীয় স্বার্থে নয়, সত্যের আলোয় দেখা।
অদিতি করিম : নাট্যকার ও কলাম লেখক
ই-মেইল: auditekarim@gmail.com
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au