মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। ছবিঃ সংগৃহীত
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বপালনরত এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পরে তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এর আগে শুক্রবার সকালে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, আঘাত, অপরাধমূলক বল প্রয়োগ, ইচ্ছাকৃত অপমান ও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে। সৌদি আরবের মদিনা থেকে বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইট ঢাকায় আসার পর ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলির সংকট দেখা দেয়। ফলে যাত্রীরা লাগেজ সংগ্রহে বিলম্বের মুখে পড়েন এবং সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের অনুরোধে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে যান। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করার সময় আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং তাকে হুমকি দেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে উদ্দেশ করে, ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’ এবং ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ ধরনের হুমকি দেন। একই সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীকে নিয়েও অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, এরপর আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন প্রটোকল সহকারী বিমানবন্দরের সংরক্ষিত ‘কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন’ বা কেপিআই এলাকায় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। সেখানে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের ভিডিও ধারণে বাধা দেন।
অভিযোগ করা হয়েছে, এতে আখতারুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ছাড়া যাত্রীদের ট্রলিতে থাকা পবিত্র জমজমের পানির বোতল ফেলে দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, বিমানবন্দরের মতো একটি সংরক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এ ধরনের ঘটনা সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি এবং স্বাভাবিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত সংগ্রহ করে তদন্ত করা হবে।
মামলায় দণ্ডবিধির ১৮৬, ১৮৯, ২৯৪, ৩২৩, ৩৫২, ৩৫৩, ৫০৪ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ধারার মধ্যে সরকারি কাজে বাধা, আঘাত করা, অপরাধমূলক বল প্রয়োগ, সরকারি কর্মকর্তাকে ভয় দেখানো ও ইচ্ছাকৃত অপমানের মতো অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর বিমানবন্দর থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, মামলা হওয়ার পর অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে শুক্রবার বিকেলে ডিবি আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর বাসিন্দা। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে দলীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান নিয়ে একাধিকবার পরিবর্তন আসে।
আখতারুজ্জামান একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ও দল থেকে তার বহিষ্কার ও পুনর্বহালের ঘটনা ঘটেছিল।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু নিয়ে টেলিভিশন টক শো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে তিনি আলোচনায় ছিলেন। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি।
বিএনপি থেকে বহিষ্কারের পর আখতারুজ্জামান গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি দলটির সঙ্গে যুক্ত নেতা হিসেবে পরিচিত।
বিমানবন্দরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় এখন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলার অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।